Explanation of Paschim Bardhaman or West Burdwan District in Bengali
পশ্চিম বর্ধমান জেলা (Paschim Bardhaman District)
পশ্চিমবঙ্গের জেলা গুলির মধ্যে একটি অন্যতম উল্লেখযােগ্য জেলা হল পশ্চিম বর্ধমান জেলা। পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল পূর্ব-উত্তর ভারতের অন্যতম বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল। জেলার সদর দফতর আসানসোল একটি শিল্প নগরী এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর।
মানচিত্র


প্রতিষ্ঠিত
পশ্চিমবঙ্গের ২৩তম জেলা হিসাবে পূর্ববর্তী বর্ধমান জেলা বিভক্ত হওয়ার পরে ৭ই এপ্রিল ২০১৭ সালে পশ্চিম বর্ধমান জেলাটি গঠিত হয়।
আয়তন
পশ্চিম বর্ধমান জেলার মোট আয়তন ১,৬০৩ বর্গ কিলােমিটার।
জনসংখ্যা
২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, পশ্চিম বর্ধমান জেলার মােট জনসংখ্যা ২,৮৮২,০৩১ জন।
- পুরুষ জনসংখ্যা – ১৪,৯৭,৪৭৯ জন (৫২%)
- মহিলা জনসংখ্যা – ১৩,৮৪,৪৫২ জন (৪৮%)
- লিঙ্গানুপাত – ৯২২ জন মহিলা/১০০০ জন পুরুষ
- সাক্ষরতার হার – ৭৮.৭৫%
সীমানা
ভৌগলিক অবস্থানগত দিক থেকে পশ্চিম বর্ধমান জেলার উত্তর সীমান্তে রয়েছে বীরভূম জেলা, দক্ষিণ সীমান্তে রয়েছে পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া জেলা, পূর্বে পূর্ব বর্ধমান জেলা এবং পশ্চিমে রয়েছে ঝাড়খন্ড রাজ্য।
নামকরণ
বর্ধমান নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে নানা মতামত রয়েছে। জৈনদের কল্পসূত্র অনুসারে মহাবীর এই অঞ্চলের অষ্টিকগ্রামে কিছু সময় কাটিয়েছিলেন, যিনি পূর্বে বর্ধমান নামেও পরিচিত ছিলেন। অন্য একটি মতে, বর্ধমান মানে সমৃদ্ধ বৃদ্ধি কেন্দ্র, উচ্চ গঙ্গা উপত্যকা থেকে আর্যানাইজেশনের অগ্রগতিতে, সীমান্ত উপনিবেশকে বৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির প্রতীক হিসাবে বর্ধমান বলা হত। আর এই বর্ধমান নাম থেকে বর্ধমান জেলা এবং বর্ধমান জেলার বিভক্তিত রূপের পশ্চিম অংশ পশ্চিম বর্ধমান নামে প্রকাশিত হয়।
ইতিহাস
আদি ঐতিহাসিক যুগে বর্ধমান ছিল রাড় অঞ্চলের একটি অংশ যেখানে মগধ, মৌর্য, কুশান এবং গুপ্তরা একের পর এক শাসন করত। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে শশাঙ্ক রাজা থাকাকালীন অঞ্চলটি গৌড় রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি এটি দখল না করা পর্যন্ত এটি পাল ও সেনদের দ্বারা শাসিত হয়েছিল।
১৬৮৯ সালে, বর্ধমান রাজ পরিবারের রাজা কৃষ্ণরাম রায় ঔরঙ্গজেব-এর থেকে ফরমান (রাজার আদেশ) পেয়েছিলেন যার দ্বারা তাঁকে বর্ধমানের জমিদার করা হয়েছিল এবং তখন থেকেই এই রাজ পরিবারের ইতিহাস এবং জেলার ইতিহাস অভিন্ন হয়ে ওঠে।
১৭৯৩ সালে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য লর্ড কর্ণওয়ালিশ দ্বারা জেলা হিসাবে বর্ধমানকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। পরবর্তীকালে ৭ই এপ্রিল ২০১৭ সালে এই বর্ধমান জেলাটিকে বিভক্ত করে পশ্চিম অংশকে পশ্চিম বর্ধমান জেলা হিসাবে গঠন করা হয়।
প্রশাসনিক বিভাগ
জেলা সদর : পশ্চিম বর্ধমান জেলার জেলা সদর হল আসানসােল।
মহকুমা : পশ্চিম বর্ধমান জেলার মহকুমা ২টি, একটি আসানসােল মহকুমা ও আর একটি দুর্গাপুর মহকুমা।
পৌরসংস্থা : পশ্চিম বর্ধমান জেলার পৌরসংস্থা ২টি, একটি আসানসােল পৌরসংস্থা, যা আয়তনে পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম পৌরসংস্থা ও আর একটি দুর্গাপুর পৌরসংস্থা।
ব্লক : পশ্চিম বর্ধমান জেলার ব্লক সংখ্যা হল ৮টি, এগুলি হল –
- কাঁকসা,
- দূর্গাপুর-ফরিদপুর,
- অন্ডাল,
- পান্ডবেশ্বর,
- রানিগঞ্জ,
- জামুড়িয়া,
- সালানপুর
- ও বারবনি।
থানা : পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ১৬টি থানা রয়েছে।
পঞ্চায়েত সমিতি : পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ৮টি পঞ্চায়েত সমিতি রয়েছে।
গ্রাম পঞ্চায়েত : পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ৬২টি গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে।
সেন্সাস টাউন : পশ্চিম বর্ধমান জেলায় রয়েছে ৬৫টি সেন্সাস টাউন।
গ্রাম : পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ৩১৬টি গ্রাম রয়েছে।
মৌজা : পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ৬১১টি মৌজা রয়েছে।
গ্রাম সংসদ : পশ্চিম বর্ধমান জেলায় রয়েছে ৮৩৩টি গ্রাম সংসদ।
জেলা পরিষদ : পশ্চির্ম বর্ধমান জেলার জেলা পরিষদের সংখ্যা ১টি।
লােকসভা কেন্দ্র : পশ্চিম বর্ধমান জেলায় লােকসভার আসন রয়েছে ২টি, একটি আসানসােল লােকসভা কেন্দ্র ও আর একটি বর্ধমান-দূর্গাপুর লােকসভা কেন্দ্র।
বিধানসভা কেন্দ্র : পশ্চিম বর্ধমান জেলায় বিধানসভার আসন রয়েছে ৯টি, এগুলি হল –
- আসানসােল উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র,
- আসানসােল দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র,
- জামুরিয়া বিধানসভা কেন্দ্র,
- রানিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র,
- কুলটি বিধানসভা কেন্দ্র,
- বারাবনি বিধানসভা কেন্দ্র,
- দুর্গাপুর পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্র,
- দুর্গাপুর পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্র ও
- পান্ডবেশ্বর বিধানসভা কেন্দ্র।
দাপ্তরিক ওয়েবসাইট : https://paschimbardhaman.gov.in/
ভূ-প্রকৃতি
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা এই পশ্চির্ম বর্ধমান জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্যও অপরূপ। এই জেলা ছােটনাগপুর মালভূমির অংশ হওয়ায় এই জেলার ভূমিভাগ অনেকাংশই অসমতল।
নদ-নদী
বর্ধমান জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত উল্লেখযােগ্য কয়েকটি নদনদী হল দামােদর, অজয়, বড়াকার, নুনীয়া ইত্যাদি।
জলবায়ু
পশ্চিম বর্ধমান জেলার জলবায়ু গ্রীষ্মমন্ডলীয় উষ্ণ এবং আর্দ্র। এই জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই জেলার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১৪৪২ মিমি।
কৃষিকাজ
পশ্চিম বর্ধমান জেলার অনুকূল পরিবেশে কৃষিকাজও অনেক ভালাে হয়। এই জেলায় ধান, গম, ভুট্টা, আলু থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের শাকসবজি, ফলমূল ও তৈলবীজ উৎপাদিত হয়।
শিল্প
পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল পূর্ব-উত্তর ভারতের অন্যতম বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল। শিল্প শহর দূর্গাপুর এ অবস্থিত দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা হল পশ্চিম বর্ধমান জেলার একটি বৃহৎ ইস্পাত করখানা। এই কারখানাটি রাষ্ট্রায়াত্ব সংস্থা SAIL-এর নিয়ন্ত্রণাধীন।

ইস্কো ইস্পাত কারখানা হল পশ্চিম বর্ধমান জেলায় অবস্থিত একটি বৃহৎ ইস্পাত কারখানা। এই কারখানাটি SAIL এর অধীনস্থ। কারখানাটি আসানসোল-এর উপকন্ঠে বার্ণপুর শহরে গড়ে উঠেছে।

ভাষা
পশ্চিম বর্ধমান জেলায় বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষদের প্রধান ভাষা হল বাংলা। তবে এই জেলায় হিন্দি, উর্দু, সাঁওতালি প্রভৃতি আরাে অন্যান্য ভাষাও প্রচলিত৷
ধৰ্ম
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, পশ্চিম বর্ধমান জেলার মোট জনসংখ্যার ৮৪.৭৫% মানুষ হিন্দু ধৰ্ম, ১৩.৩২% মানুষ ইসলাম ধৰ্ম, ০.৪৪% মানুষ খ্রিস্টান ধৰ্ম এবং বাকি মানুষেরা অন্যান্য ধৰ্ম পালন করেন।
শিক্ষা
পশ্চিম বর্ধমান জেলার মােট সাক্ষরতার হার ৭৮.৭৫ শতাংশ। এই জেলার উল্লখযােগ্য কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হল –
- কাজী নজরুল ইউনিভার্সিটি,
- দুর্গাপুর গভর্নমেন্ট কলেজ,
- বিধান চন্দ্র কলেজ,
- দেশবন্ধু মহাবিদ্যালয়,
- কাজী নজরুল ইসলাম মহাবিদ্যালয়,
- আসানসােল গার্লস কলেজ,
- আসানসােল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ,
- দুর্গাপুর ওমেনস্ কলেজ,
- ন্যাশনাল ইন্সটিটিউড অফ টেকনলেজি – দুর্গাপুর ইত্যাদি।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য
পশ্চিম বর্ধমান জেলা কেবল সমৃদ্ধ শিল্পের জন্যই নয়, মনোরম পর্যটন, পবিত্র মন্দির, পুরাতন গীর্জা, সুন্দর পার্ক, আর্টস এবং সাহিত্যের জন্যও সুপরিচিত। এই জেলার সদর দফতর আসানসোল একটি শিল্প নগরী এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর।
পরিবহন ব্যবস্থা
পশ্চিম বর্ধমান জেলায় পরিবহন ব্যবস্থা হিসাবে উন্নত সড়কপথ তাে রয়েছেই, সঙ্গে রেলপথ ও আকাশপথেরও ব্যবস্থা রয়েছে। এই জেলার কয়েকটি উল্লেখযােগ্য রেলওয়ে স্টেশন হল আসানসােল রেলওয়ে স্টেশন, দুর্গাপুর রেলওয়ে স্টেশন, অন্ডাল রেলওয়ে স্টেশন, রানীগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন ইত্যাদি এবং এই জেলার একটি বিমানবন্দর হল কাজী নজরুল ইসলাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
বিশিষ্ট ব্যক্তি
পশ্চিম বর্ধমান জেলার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হলেন –
- কাজী নজরুল ইসলাম : বিদ্রোহী কবি নামে পরিচিত বাঙালি কবি, লেখক, সংগীতশিল্পী।
- মিকা সিং : ভারতীয় গায়ক।
- শর্মিলা ঠাকুর : ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী।
- তিমির বিশ্বাস : বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের ভারতীয় প্লেব্যাক গায়ক।
- অর্জুন আটওয়াল : ভারতীয় পেশাদার গল্ফার। – প্রমুখ।
দর্শনীয় স্থান
পশ্চিম বর্ধমান জেলার উল্লেখযােগ্য দর্শনীয় স্থানগুলি হল –
ঘাঘর বুড়ি মন্দির
পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল শহরের উপকণ্ঠে রাঢ় বাংলার জাগ্রত দেবী মা শ্রী শ্রী ঘাঘর বুড়ির মন্দিরটি অবস্থিত। এটি কালী দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত একটি মন্দির। এই মন্দিরটি আসানসোলের প্রাচীনতম মন্দির। প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে প্রতি বছর ১৫ই জানুয়ারি একটি দেশীয় মেলা বসে। উপাসনার অংশ হিসাবে পশুবলিও দেওয়া হয়।

মাইথন বাঁধ
আসানসােলের এই মাইথন বাঁধ গাছপালা, জল এবং দুরের পাহাড়ের দৃশ্যসমেত একটি মনােরম জায়গা। এটি ১৫,৭১২ ফুট দীর্ঘ এবং ১৬৫ ফুট উচ্চ। এই বাঁধটি বিশেষভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এবং এই বাঁধটি ৬০,০০০ কিলোওয়াট বৈদ্যুতিক বিদ্যুৎও উৎপাদন করে।

গড় জঙ্গল
গড় জঙ্গল হিন্দু পুরাণে বিশেষ করে শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এটি পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর মহকুমার কাঁকসা সিডি ব্লকে (দুর্গাপুরের কাছে) অবস্থিত।

এছাড়াও –
- কল্যাণেশ্বরী মন্দির,
- ইছাই ঘোষের দেউল,
- সেক্রেড হার্ট চার্চ,
- বার্নপুর নেহেরু পার্ক,
- জগন্নাথ মন্দির,
- শতাব্দী পার্ক,
- চুরুলিয়া ইত্যাদি৷
ভিডিও ↴
পশ্চিম বর্ধমান জেলার সংক্ষিপ্ত পরিচয় | Explanation of Paschim Bardhaman or West Burdwan District in Bengali –
আরো ভিডিও দেখুন
(Explanation of Paschim Bardhaman or West Burdwan District in Bengali)