Explanation of Howrah District in Bengali
হাওড়া জেলা (Howrah District)
পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলির মধ্যে একটি অন্যতম উল্লেখযােগ্য জেলা হল হাওড়া জেলা। পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম জেলা এই হাওড়া জেলা ভারতের গ্লাসগাে নামে পরিচিত।
মানচিত্র


প্রতিষ্ঠিত
হাওড়া জেলাটি গঠিত হয় ১লা জানুয়ারি ১৯৩৮ সালে।
আয়তন
আয়তনে পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম জেলা হাওড়া জেলার মােট আয়তন ১,৪৬৭ বর্গ কিলােমিটার।
জনসংখ্যা
২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, হাওড়া জেলার মােট জনসংখ্যা ৪,৮৫০,০২৯ জন।
- পুরুষ জনসংখ্যা – ২,৫০০,৮১৯ জন
- মহিলা জনসংখ্যা – ২,৩৪৯,২১০ জন
- জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার – ১৩.৫০%
- জনঘনত্ব – ৩,৩০৬ জন/বর্গ কিলোমিটার
- লিঙ্গ অনুপাত – ৯৩৯ জন মহিলা/১০০০ জন পুরুষ
- স্বাক্ষরতার হার – ৮৩.৩১%
সীমানা
ভৌগলিক অবস্থানগত দিক থেকে হাওড়া জেলার উত্তর সীমান্তে রয়েছে হুগলি জেলা, দক্ষিণ সীমান্তে রয়েছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলা, পূর্বে রয়েছে কোলকাতা ও উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলা এবং পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা।
নামকরণ
হাওড়া জেলার নামকরণ করা হয়েছে এই জেলার জেলা সদর ‘হাওড়া’র নামানুসারে। আর এই ‘হাওড়া’ নামটির উৎপত্তি নিয়ে নানা মতামত রয়েছে। একটি মতে, বর্তমান হাওড়া শহরের অদুরে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ‘হাড়িড়া’ নামে একটি গ্রামের অস্তিত্ব ছিল, ‘হাওড়া’ নামটি এই ‘হাঁড়িড়া’ নামেরই অপভ্রংশ। আর একটি মতে ‘হাওড়া’ নামটির উৎপত্তি ‘হাবড়’ শব্দটি থেকে, যার অর্থ ‘যেখানে পাঁক ও কাদা বেশি হয়’।
ইতিহাস
বিংশ শতাব্দী পূর্বে পৃথক জেলা হিসাবে হাওড়ার কোনাে অস্তিত্ব ছিল না। ১৭৬০ সালে হাওড়া অঞ্চলটি বর্ধমানের অন্তর্গত হয়। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের পর হাওড়া ব্রিটিশদের অধিকারভুক্ত হয়। এরপর ১৭৯৫ সালে মান জেলা থেকে হুগলি জেলাকে পৃথক করা হয়। হাওড়া জেলা সেই সময় হুগলি জেলার অন্তর্গত ছিল। পরবর্তীতে ১৮৪৩ সালে হাওড়া আবারও হুগলি জেলা থেকে বিভক্ত হয়। এরপর ১৯৩৮ সালের ১লা জানুয়ারি হাওড়া জেলা একটি পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা পায়। সেই সময় স্বাধীনতার পরও হাওড়া জেলা বর্ধমান বিভাগের অন্তর্গত ছিল। পরে ১৯৬৩ সালে এই জেলা প্রেসিডেন্সি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হয়৷
প্রশাসনিক বিভাগ
জেলা সদর : হাওড়া জেলার জেলা সদর হল হাওড়া।
মহকুমা : হাওড়া জেলার মহকুমা ২টি –
- হাওড়া সদর মহকুমা ও
- উলুবেড়িয়া মহকুমা।
পৌরসংস্থা : হাওড়া জেলায় ১টি পৌরসংস্থা রয়েছে, এটি হল হাওড়া পৌরসংস্থা।
পৌরসভা : হাওড়া জেলার পৌরসভা ১টি, এটি হল উলুবেরিয়া পৌরসভা।
ব্লক : হাওড়া জেলার ব্লক সংখ্যা হল ১৪টি, এগুলি হল –
- বালি-জগাছা,
- ডোমজুর,
- পাঁচলা,
- সাঁকরাইল,
- জগৎবল্লভপুর,
- উলুবেরিয়া-১,
- উলুবেড়িয়া-২,
- আমতা-১,
- আমতা-২,
- বাগনান-১,
- বাগনান-২,
- শ্যামপুর-১,
- শ্যামপুর-২ ও
- উদয়নারায়ণপুর।
থানা : হাওড়া জেলায় ২৬টি থানা রয়েছে।
সেন্সাস টাউন : হাওড়া জেলায় রয়েছে ৫০টি সেন্সাস টাউন।
পঞ্চায়েত সমিতি : হাওড়া জেলায় ১৪টি পঞ্চায়েত সমিতি রয়েছে।
গ্রাম পঞ্চায়েত : হাওড়া জেলায় ১৫৭টি গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে।
গ্রাম : হাওড়া জেলায় গ্রাম রয়েছে ৭২৭টি।
মৌজা : হাওড়া জেলায় মৌজা রয়েছে ৮৩৬টি।
গ্রাম সংসদ : হাওড়া জেলায় ২,৪৩০টি গ্রাম সংসদ রয়েছে।
জেলা পরিষদ : হাওড়া জেলার জেলা পরিষদের সংখ্যা ১টি।
লােকসভা কেন্দ্র : হাওড়া জেলায় লােকসভার আসন রয়েছে ৩টি, এগুলি হল –
- হাওড়া লােকসভা কেন্দ্র,
- উলুবেরিয়া লােকসভা কেন্দ্র ও
- শ্রীরামপুর লােকসভা কেন্দ্র (কিছু অংশ)।
বিধানসভা কেন্দ্র : হাওড়া জেলায় বিধানসভার আসন রয়েছে ১৬টি, এগুলি হল –
- ১৬৯ – বালি বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৭০ – হাওড়া উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৭১ – হাওড়া মধ্য বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৭২ -শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৭৩ – হাওড়া দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৭৪ – সাঁকরাইল বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৭৫ – পাঁচলা বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৭৬ – উলুবেড়িয়া পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৭৭ – উলুবেরিয়া উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৭৮ – উলুবেড়িয়া দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৭৯ – শ্যামপুর বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৮০ – বাগনান বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৮১ – আমতা বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৮২ – উদয়নারায়ণপুর বিধানসভা কেন্দ্র,
- ১৮৩ – জগৎবল্লভপুর বিধানসভা কেন্দ্র ও
- ১৮৪ – ডোমজুর বিধানসভা কেন্দ্র।
দাপ্তরিক ওয়েবসাইট : https://howrah.gov.in/
ভূ-প্রকৃতি
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রেসিডেন্সি বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা এই হাওড়া জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্যও অপরূপ। দামােদর নদ বিধৌত হাওড়া জেলা দক্ষিণবঙ্গের পলল সমভূমির উপর অবস্থিত। এই জেলার ভূমিরূপের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল উঁচু নদীপাড় ও দীর্ঘ জলাশয়।
নদ-নদী
হাওড়া জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত উল্লেখযােগ্য নদনদীগুলি হল হুগলি, রূপনারায়ণ, দামােদর, সরস্বতী প্রভৃতি।

জলবায়ু
হাওড়া জেলার জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র প্রকৃতির। এই জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এই জেলার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমান ১,৪৬১ মিমি।
অর্থনীতি
হাওড়া জেলার অর্থনীতি মূলত শিল্প, চাকরী ও কৃষিনির্ভর।
কৃষিকাজ
উর্বর পলিমৃত্তিকার কারণে এই জেলা কৃষিকাজেও অনেক উন্নত। এই জেলায় ধান, গম, আলু, ডাল, থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের শাকসবজি, ফলমূল ও তৈলবীজ উৎপাদিত হয়।
শিল্প
উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে হাওড়া জেলা বাংলার একটি প্রধান শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয়। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শিল্পের জন্য এই জেলা দীর্ঘকাল ধরে বিখ্যাত।
ভাষা
বাংলা ভাষা হল হাওড়া জেলায় বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষদের প্রধান ভাষা, তবে এই জেলায় হিন্দি, উর্দু প্রভৃতি আরাে অন্যান্য ভাষাও প্রচলিত।
শিক্ষা
হাওড়া জেলার মােট শিক্ষার হার ৮৩.৩১ শতাংশ। এই জেলার উল্লেখযােগ্য কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হল –
- রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ এডুকেশনাল অ্যান্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউট,
- নরসিংহ দত্ত কলেজ,
- রামসদয় কলেজ,
- বাগনান কলেজ,
- উলুবেড়িয়া কলেজ,
- প্রভু জগদ্বন্ধু কলেজ,
- ড. কানাইলাল ভট্টাচার্য কলেজ,
- লালবাবা কলেজ,
- মহেশ ভট্টাচার্য হােমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ,
- ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনলেজি – শিবপুর ইত্যাদি।

পরিবহন ব্যবস্থা
হাওড়া জেলায় পরিবহন ব্যবস্থা হিসাবে উন্নত সড়কপথ তাে রয়েছেই, সঙ্গে রেলপথও রয়েছে। এই জেলার কয়েকটি উল্লেখযােগ্য রেলওয়ে স্টেশন হল হাওড়া জংশন রেলওয়ে স্টেশন, উলুবেড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন, বাগনান রেলওয়ে স্টেশন, শালিমার রেলওয়ে স্টেশন ইত্যাদি। এই জেলার নিকটতম বিমানবন্দর নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা দমদমে অবস্থিত।

বিশিষ্ট ব্যক্তি
হাওড়া জেলার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হলেন –
- শিশিরকুমার ভাদুড়ী : আধুনিক বাংলা নাট্যজগতের পথিকৃৎ, খ্যাতনামা অভিনেতা এবং নাট্যকার ছিলেন।
- সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় : একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পন্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ ছিলেন।
- ননীবালা দেবী : একজন বাঙালি বিপ্লবী ও প্রথম মহিলা রাজবন্দী ছিলেন।
- কানন দেবী : ভারতীয় বাঙালি অভিনেত্রী, লেখিকা ও সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন, যিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে নায়িকাদের মধ্যে প্রথম গায়িকা এবং বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম তারকা হিসাবে স্বীকৃত।
- মনােজ কুমার তিওয়ারি : একজন ভারতীয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। – প্রমুখ।
দর্শনীয় স্থান
হাওড়া জেলার উল্লেখযােগ্য দর্শনীয় স্থানগুলি হল –
বেলুড় মঠ
রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান কার্যালয় এই বেলুড় মঠ ১৮৯৭ সালে হাওড়ার বেলুড়ে গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ভারতের একটি প্রধান পর্যটন কেন্দ্র এবং ভক্তদের নিকট একটি পবিত্র তীর্থস্থান।

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু বটানিক্যাল গার্ডেন
হাওড়ার শিবপুরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক উদ্ভিদ উদ্যান হল এই আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু বটানিক্যাল গার্ডেন। ২৭৩ একর আয়তন বিশিষ্ট এই উদ্যানে বর্তমানে মােট ১,৪০০ প্রজাতির প্রায় ১৭,০০০ গাছ রয়েছে। আর এই উদ্যানের মূল আকর্ষন হল বিশাল বটবৃক্ষ নামে একটি ২৫০ বছরের প্রাচীন বটগাছ, যা দেড় একর জমির উপর শত শত ঝরি নিয়ে বিরাজমান।

হাওড়া ব্রিজ
হুগলি নদীর উপর অবস্থিত কলকাতা ও হাওড়া শহরের মধ্যে সংযােগরক্ষাকারী সেতুগুলির মধ্যে একটি অন্যতম সেতু হল রবীন্দ্র সেতু, যা পূর্বতম নামানুসারে এখনাে হাওড়া ব্রিজ নামে পরিচিত।

বিদ্যাসাগর সেতু
হুগলি নদীর উপর অবস্থিত ভারত তথা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও উচ্চতম একটি ঝুলন্ত সেতু হল হাওড়া ও কলকাতা শহরের সংযােগরক্ষাকারী এই বিদ্যাসাগর সেতু।

গাদিয়াড়া
উলুবেড়িয়া মহকুমার অন্তর্গত হুগলি ও রুপনারায়ণ নদীর মিলনস্থল এই গাদিয়াড়া হাওড়া জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র।

এছাড়াও –
- গড়চুমুক,
- বিবেকানন্দ ও নিবেদিতা সেতু,
- রেল মিউজিয়াম,
- পানিত্রাস-সামতাবেড়,
- কল্যাণেশ্বর মন্দির,
- মদনগােপাল জীউ মন্দির ইত্যাদি।
ভিডিও ↴
হাওড়া জেলার সংক্ষিপ্ত পরিচয় | Explanation of Howrah District in Bengali –
আরো ভিডিও দেখুন
(About Howrah District in Bengali)