Tuesday, April 1, 2025

নাগাল্যান্ড রাজ্যের পরিচয় – Nagaland State, India

Explanation of Nagaland State in Bengali

Share

About Nagaland State in Bengali

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য এবং বৈচিত্র্যময় নানান ঐতিহ্যে ঘেরা ভারতের একটি রহস্যময় রাজ্য। যেখানকার সংস্কৃতি, রীতিনীতি, ভাষা, খাদ্যাভাস, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি সবই ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যাকে বলা হয়ে থাকে ভারতের উৎসবের দেশ। ভারতের রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক ভারতের রাজ্য নাগাল্যান্ড সম্পর্কে –

নাগাল্যান্ড রাজ্য

Nagaland State

অবস্থান


ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হল নাগাল্যান্ড। যার উত্তরসীমান্তে রয়েছে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আসাম রাজ্য, দক্ষিণ সীমান্তে রয়েছে ভারতের মণিপুর রাজ্য, পূর্ব সীমান্তে রয়েছে মায়ানমার রাষ্ট্র এবং পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে ভারতের আসাম রাজ্য।

মানচিত্র


Map of Nagaland State
Map of Nagaland state with 16th districtsLocation of Nagaland state map in Map of India
নাগাল্যান্ড রাজ্যের মানচিত্র (Map of Nagaland State with districts)ভারতের মানচিত্রে নাগাল্যান্ড রাজ্যের অবস্থান (Nagaland state in Map of India)

আয়তন ও জনসংখ্যা


ভারতের সেভেন সিস্টার্স এবং ক্ষুদ্রতম রাজ্যগুলির মধ্যে একটি, নাগাল্যান্ডের মোট আয়তন ১৬,৫৭৯ বর্গ কিলোমিটার, যা আয়তনে ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে ২৫তম রাজ্য।

নাগাল্যান্ডের মোট জনসংখ্যা ১৯,৮০,৬০২ জন, যা জনসংখ্যার বিচারে ভারতের রাজাগুলির মধ্যে ২৪তম রাজ্য। রাজ্যের জনঘনত্ব অর্থাৎ প্রতি বর্গ কিলোমিটারে এই রাজ্যে ১১৯ জন মানুষ বসবাস করে। তবে নাগাল্যান্ড রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশই গ্রামীণ এলাকাবাসী এবং জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে।

২০১১ সালের আদমশুমারির বিবরণ অনুসারে, নাগাল্যান্ড রাজ্যের জনসংখ্যার তথ্য –

Population data of Nagaland state 2011
প্রকৃত জনসংখ্যা১,৯৭৮,৫০২ জন
পুরুষ১,০২৪,৬৪৯ জন
মহিলা৯৫৩,৮৫৩ জন
জনসংখ্যা বৃদ্ধি-০.৫৮%
মোট জনসংখ্যার শতাংশ০.১৬%
লিঙ্গ অনুপাত৯৩১
শিশু লিঙ্গ অনুপাত৯৪৩
ঘনত্ব/বর্গ কিমি১১৯
এলাকা (বর্গ কিমি)১৬,৫৭৯
মোট শিশু জনসংখ্যা (০-৬ বয়স)২৯১,০৭১ জন
সাক্ষরতা৭৯.৫৫%
পুরুষ সাক্ষরতা৮২.৭৫%
মহিলা সাক্ষরতা৭৬.১১%

নামকরণ


নাগাল্যান্ড রাজ্যের নামকরণে ‘নাগা’ শব্দের উৎপত্তি অস্পষ্ট। তবে মনে করা হয় ‘নাগা’ শব্দটি বার্মিজ শব্দ ‘Na-Ka’ বা ‘Naga’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘কানের দুলওয়ালা মানুষ’।

দক্ষিণ এশিয়ায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার আগমনের আগে, ভারতের উত্তর-পূর্বে নাগা, মেইটিস এবং অন্যান্যদের উপর বার্মা থেকে অনেক যুদ্ধ, নিপীড়ন এবং অভিযান হয়েছিল। হানাদাররা মূলত মাথা শিকার এবং এই উপজাতি ও জাতিগোষ্ঠীর কাছ থেকে সম্পদ লুণ্ঠন এবং এদের বন্দী করার জন্য এসেছিল। ব্রিটিশরা যখন উত্তর হিমালয়ে বসবাসকারী লোকদের সম্পর্কে বার্মিজ গাইডদের জিজ্ঞাসা করেছিল, তখন এদের বলা হয়েছিল নাকা। আর ব্রিটিশরা এটিকে ‘নাগা’ হিসাবে রেকর্ড করে। আর এই নাগাদের বসবাসকারী ভুমিই নাগাল্যান্ড নামে পরিচিতি পায়।

ইতিহাস


নাগাদের প্রাচীন ইতিহাসও অস্পষ্ট। নাগারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছে, সর্বশেষে প্রত্যেকেই বর্তমান ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশে বসতি স্থাপন করেছে এবং তাদের নিজ নিজ সার্বভৌম পর্বত অঞ্চল এবং গ্রাম-রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে।

উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমনের সাথে সাথে ব্রিটিশ রাজ নাগা পাহাড়সহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের শাসন ব্যবস্থা প্রসারিত করে। ফলে নিজেদের শাসন ব্যবস্থা রক্ষার্থে ব্রিটিশদের সঙ্গে নাগারা নানান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে ওঠেন। একের পর এক যুদ্ধের পর, ব্রিটিশরা নাগা উপজাতিদের প্রতি সতর্কতা এবং অ-হস্তক্ষেপের নীতি গ্রহণ করে।

১৮৮০ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে, ব্রিটিশ প্রশাসন নাগা পাহাড়ের একটি বিশাল এলাকা জুড়ে তাদের অবস্থানকে সুসংহত করে এবং এই অঞ্চলটিকে আসামের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করে। এমনকি ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতার পরও নাগাল্যান্ড আসাম রাজ্যের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে থাকে। ফলে পরবর্তীতে নাগাদের একটি অংশের মধ্যে জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপের উদ্ভব হয় এবং শুরু হয় একটি রাজনৈতিক ইউনিয়ন দাবির আন্দোলন। আন্দোলনের ফলে একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটে, যা সরকারি ও বেসামরিক অবকাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। এমনকি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ১৯৫৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারকে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাঠাতে হয়েছিল।

এরপর, ১৯৫৭ সালে নাগা নেতৃবৃন্দ এবং ভারত সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা নাগা পাহাড়কে একটি পৃথক অঞ্চলে পরিণত করে এবং এই অঞ্চলটি ভারতের একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়। ১৯৬০ সালের জুলাই মাসে, প্রধানমন্ত্রী নেহেরু এবং নাগা পিপল কনভেনশনের নেতাদের মধ্যে আলোচনার পর, একটি ১৬-দফা চুক্তি হয় যার মাধ্যমে ভারত সরকার নাগাল্যান্ডকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। তবে নাগাল্যান্ডকে পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ১লা ডিসেম্বর ১৯৬৩ সালে এবং কোহিমাকে রাজ্যের রাজধানী হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

প্রশাসনিক বিভাগ


রাজধানী : নাগাল্যান্ড রাজ্যের রাজধানী হল কোহিমা।

জেলা : নাগাল্যান্ড রাজ্যটিতে সর্বমোট ১৬টি জেলা রয়েছে। এগুলি হল –

District list of Nagaland state
জেলাসদর দপ্তরজনসংখ্যা (২০১১ জনগণনা)আয়তন (বর্গ কিমি)

বৃহত্তম গ্রাম : কোহিমা গ্রাম।

সরকার ও রাজনীতি

নাগাল্যান্ড বিধানসভা নামে পরিচিত নাগাল্যান্ড রাজ্যের আইনসভা ৬০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত এককক্ষবিশিষ্ট। এছাড়াও রাজ্যসভা এবং লোকসভার জন্য এই রাজ্যে ১টি করে সংসদীয় আসন রয়েছে। বিচার ব্যবস্থার দিক থেকে নাগাল্যান্ড রাজ্যটি গৌহাটি হাইকোর্টের এক্তিয়ারভূক্ত এবং গৌহাটি হাইকোর্টের কোহিমা বেঞ্জ দ্বারা এই রাজ্যের বিচার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয়।

রাজ্য প্রতীক


State Symbols of Nagaland state
রাজ্য পশুমিথুন বা গয়াল (Mithun)
রাজ্য পাখিব্লাইদের ট্রাগোপ্যান (Blyth’s Tragopan)
রাজ্য গাছআন্ডার (Alder)State Tree of Nagaland State
রাজ্য ফুললালী গুরাস বা রডোডেনড্রন (Rhododendron)State flower of Nagaland State

ভূপ্রকৃতি


নাগাল্যান্ড রাজ্যটি মূলত একটি পাহাড়ি রাজ্য। আর এই রাজ্যের পাহাড় নাগাপাহাড় নামে পরিচিত। আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে নাগাপাহাড়গুলি প্রায় ৬১০ মিটার পর্যন্ত উত্থিত এবং আরও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এই পাহাড়গুলি প্রায় ১৮০০ মিটার পর্যন্ত উত্থিত হয়েছে। ৩৮৪১ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট মাউন্ট সরমতি হল নাগাল্যান্ড রাজ্যের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ।

নদনদী ও হ্রদ


উত্তরে ডোয়াং এবং ডিফুর মতো নদী, দক্ষিণ-পশ্চিমে বরাক নদী সমগ্র নাগাল্যান্ড রাজ্যকে বিচ্ছিন্ন করে তুলেছে।

জলবায়ু


নাগাল্যান্ড রাজ্যের জলবায়ু উচ্চ আর্দ্রতা সহ বৃহৎভাবে মৌসুমি জলবায়ুর অন্তর্গত। গ্রীষ্মকালে এই রাজ্যের তাপমাত্রা ১৬ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এর মধ্যে হয়ে থাকে এবং শীতকালে তাপমাত্রা সাধারণত ৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত নীচে নেমে আসে। ফলে এই সময় রাজ্যের কিছু কিছু উচ্চতম স্থানগুলিতে তুষারপাতও ঘটে থাকে।

গ্রীষ্মকাল হল এই রাজ্যের সবচেয়ে ছোট ঋতু, আর এরাজ্যের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে ঠান্ডা এবং শুষ্ক আবহাওয়াসহ শীত প্রায়ই খুব তাড়াতাড়ি চলে আসে। এছাড়াও এরাজ্যের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৮০০ থেকে ২৫০০ মিলিমিটার, যা মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ঘনীভূত হয়।

উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত


নাগাল্যান্ডের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ এলাকা গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং উপ-গ্রীষ্মমন্ডলীয় চিরহরিৎ বনাঞ্চল দ্বারা আচ্ছাদিত। যার মধ্যে রয়েছে পাম, বাঁশ, বেত এবং মেহগনি বন। তবে এরাজ্যের কিছু বনাঞ্চল ঝুম চাষের জন্য পরিষ্কার করা হয়েছে।

এনটাংকি জাতীয় উদ্যান (Ntangki National Park), পুলি বাদজে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (Pulie Badze Wildlife Sanctuary), ফাকিম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (Fakim Wildlife Sanctuary) এবং রাঙ্গাপাহাড় সংরক্ষিত বন (Rangapahar Reserve Forest) হল নাগাল্যান্ডের কয়েকটি প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগার।

নাগাল্যান্ডে পাওয়া কিছু উল্লেখযোগ্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে রয়েছে ধীর লরিস, আসামি বানর, ছোটলেজি বানর, রেসাস বানর বা লাল বান্দর, মুখপোড়া হনুমান বা লালচে হনুমান, বেঙ্গল টাইগার, ভারতীয় চিতাবাঘ ইত্যাদি।

নাগাল্যান্ড রাজ্যটি ৪৯০ টিরও বেশি প্রজাতির পাখি দ্বারা সমৃদ্ধ। গ্রেট ইন্ডিয়ান হর্নবিল নাগা সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ প্রজাতির পাখি। এছাড়াও এই রাজ্যটি বিশ্বের ফ্যালকন ক্যাপিটাল হিসাবেও পরিচিত।

মিথুন হল নাগাল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় প্রাণী, যা নাগাল্যান্ড সরকারের সরকারী সীল হিসাবে গৃহীত হয়েছে এবং এই প্রাণী আনুষ্ঠানিকভাবে এই রাজ্যের সবচেয়ে মূল্যবান প্রজাতি।

অর্থনীতি


নাগাল্যান্ড রাজ্যের অর্থনীতি মুলত কৃষি, শিল্প এবং প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল।

কৃষি


এই রাজ্যের বেশিরভাগ জনসংখ্যাই গ্রামীণ চাষের মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। উৎপাদিত ফসলগুলির মধ্যে এরাজ্যের প্রধান ফসলগুলি হল ধান, বাজরা, ভূট্টা এবং ডাল। এছাড়াও আখ এবং আলুর মতো অর্থকরী ফসলও কিছু পরিমাণে চাষ হয়ে থাকে। প্রিমিয়াম কফি, এলাচ এবং চায়ের মতো বৃক্ষরোপন ফসলগুলিও এরাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে চাষ করা হয়।

শিল্প


শিল্প হিসাবে কুটির শিল্প, যেমন তাঁত, কাঠের কাজ এবং মৃৎশিল্প রাজ্য রাজদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এছাড়াও পর্যটন শিল্প রাজ্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য শিল্প।

প্রাকৃতিক সম্পদ


প্রাকৃতিক সম্পদ হিসাবে এরাজ্যে চুনাপাথর, মার্বেল এবং অন্যান্য আলংকারিক পাথরের মজুত প্রচুর এবং অন্যান্য খনিজগুলির মধ্যে রয়েছে লোহা নিকেল, ক্রোমিয়াম এবং কোবাল্ট। এছাড়াও বেশ কিছু প্রাথমিক গবেষণা পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধারযোগ্য মজুদ নির্দেশ করে।

জাতিগোষ্ঠী


জাতিগত দিক থেকে নাগাল্যান্ড রাজ্যটিতে অন্যান্য বিভিন্ন উপ-উপজাতিদের সাথে ১৭টি প্রধান উপজাতি বসবাস করে এবং প্রতিটি উপজাতিই রীতিনীতি, ভাষা ও পোশাকের দিক থেকে অন্য গোষ্ঠীর থেকে স্বতন্ত্র। তবে নাগা জনগোষ্ঠীই এই রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনজাতি, যা রাজ্যের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশেরও বেশি।

ভাষা


১৯৬৭ সালে নাগাল্যান্ড বিধানসভা ভারতীয় ইংরেজি ভাষাকে নাগাল্যান্ডের সরকারী ভাষা হিসাবে ঘোষণা করে। শিক্ষার মাধ্যম হিসাবেও এরাজ্যে ইংরেজি ভাষা ব্যবহৃত হয়। তবে ইংরেজি ছাড়া এরাজ্যে কথিত প্রধান ভাষাগুলি হল কন্যাক, আও, লোথা, আঙ্গামি, চোকরি, সঙ্গম, বাংলা, নেপালি ইত্যাদি।

ধর্ম


ধর্মগত দিক থেকে নাগাল্যান্ড রাজ্যে বসবাসকারী জনসংখ্যার ৮৮% মানুষ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী, ৯% মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী, ২% ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং বাকি ১% মানুষ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।

শিক্ষাব্যবস্থা


শিক্ষাগত দিক থেকে নাগাল্যান্ড রাজ্যের সাক্ষরতার হার প্রায় ৮১ শতাংশ।

সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য


সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ঘেরা নাগাল্যান্ড রাজ্যের প্রতিটি উপজাতির নিজস্ব অনন্য নকশা এবং রং রয়েছে। প্রত্যেকটি উপজাতিই তাদের নিজস্ব নকশা এবং রং-এর দ্বারা বিভিন্ন রকমের পোশাক, শাল, কাঁধের ব্যাগ, আলংকারিক বর্শা, টেবিল ম্যাট, কাঠের খোদাই, বাঁশের বিভিন্ন সরঞ্জাম ইত্যাদি তৈরি করে থাকে।

লোকসংগীত ও লোকনৃত্য

লোকগান এবং নৃত্য ঐতিহ্যগত নাগা সংস্কৃতির অপরিহার্য উপাদান। এরাজ্যের মৌখিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে লোকগাথা ও গানের মাধ্যমে। নাগা লোকগীতিগুলি রোমান্টিক এবং ঐতিহাসিক উভয়ই। গানগুলি এরাজ্যের বিখ্যাত পূর্বপুরুষদের সম্পূর্ণ গল্প এবং ঘটনা বর্ণনা করে। যুদ্ধের নৃত্য এবং স্বতন্ত্র নাগা জাতিগোষ্ঠীর অন্যান্য নৃত্যগুলি নাগাল্যান্ডের একটি প্রধান শিল্প।

উৎসব

নাগাল্যান্ড রাজ্যটি ভারতে উৎসবের দেশ হিসাবেও পরিচিত। কেনোনা এরাজ্যের জাতিগত বৈচিত্র্য এবং প্রত্যেকের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, একটি বছরব্যাপী উদযাপনের পরিবেশ তৈরি করে। ফলে সারা বছর ধরে এই রাজ্যের প্রত্যেক উপজাতিরা তাদের নিজস্ব নানান উৎসবগুলিকে জাকজমকভাবে পালন করে থাকে।

নাগাল্যান্ড রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে উন্নত করার জন্য নাগাল্যান্ড সরকার দ্বারা প্রতি বছর হর্ণবিল উৎসব আয়োজিত হয়ে থাকে, যা এরাজ্যের একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য উৎসব। ১০ দিন ব্যাপি উৎযাপিত এই উৎসবে নাগাল্যান্ড রাজ্যের প্রায় সমস্ত উপজাতিই অংশ গ্রহণ করে থাকেন। এই উৎসবের উদ্দেশ্য হল নাগাল্যান্ডের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত ও রক্ষা করা এবং এর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য প্রদর্শন করা।

খেলাধুলা

নাগাল্যান্ড রাজ্যের কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী খেলা হল –

কেন বা নাগা কুস্তি : এটি একটি লোক কুস্তি শৈলী। এই খেলার উদ্দেশ্য হল প্রতিপক্ষের শরীরের হাঁটুর ওপরের যে কোনো অংশকে মাটিতে নিয়ে আসা।

আকিকিতি বা সুমি কিক ফাইটিং : এটি একটি ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধ খেলা। খেলার পদ্ধতি শুধুমাত্র পায়ের তলগুলি ব্যবহার করে লাথি মারা এবং ব্লক করা।

রন্ধনপ্রণালী


খাবারের দিক থেকে নাগাল্যান্ডের সমস্ত জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব রন্ধনপ্রণালী রয়েছে এবং তারা তাদের খাবারে প্রচুর মাছ, মাংস এবং গাঁজনযুক্ত পণ্য ব্যবহার করে থাকেন। এরাজ্যের বিখ্যাত খাবারের মধ্যে রয়েছে শুয়োরের মাংস এবং সিল্কওয়ার্ম লার্ভা দিয়ে রান্না করা শামুক, যা রাজ্যের একটি ব্যয়বহুল খাবার। তাছাড়া এরাজ্যের বসবাসকারী উপজাতিরা মাংস হিসাবে কুকুরের মাংস থেকে শুরু করে বিভিন্ন নানান প্রজাতির প্রাণীর মাংস খেয়ে থাকেন।

পরিবহন ব্যবস্থা


সড়ক

নাগাল্যান্ডের রুক্ষ এবং পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপ পরিবহনের অবকাঠামোগত উন্নয়নে একটি বড় বাধা উপস্থাপন করে। ফলে সড়কপথগুলিই এই রাজ্যের পরিবহন নেটওয়ার্কের প্রধান মাধ্যাম হিসাবে কাজ করে। এরাজ্যের মধ্য দিয়ে রয়েছে দুটি আন্তজার্তিক মহাসড়ক এশিয়ান হাইওয়ে-১ এবং এশিয়ান হাইওয়ে-২, এছাড়াও রয়েছে NH-2, NH-29, NH-129 ইত্যাদি জাতীয় মহাসড়কগুলি।

রেল

নাগাল্যান্ড রাজ্যটিতে রেলওয়ের সুবিধাও খুবই কম। রাজ্যের একমাত্র রেলওয়ে স্টেশন ডিমাপুর রেলওয়ে স্টেশন।

বিমান

আকাশপথ হিসাবে ডিমাপুর বিমানবন্দর হল নাগাল্যান্ডের একমাত্র বিমানবন্দর, যেখান থেকে বর্তমানে শুধুমাত্র কোলকাতা, গুয়াহাটি, ইম্ফল এবং ডিব্রুগড়ের উদ্দেশ্যেই যাত্রা করা যায়।

পর্যটন


নাগাল্যান্ড রাজ্যটি তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং আকর্ষণীয় ল্যান্ডস্কেপের দ্বারা যে কোনো ভ্রমণকারীর হৃদয় জয় করে নেয় অনায়াসেই। আসলে নাগাল্যান্ড রাজ্যটি বিভিন্ন নানান পর্যটন কেন্দ্রে ভরপুর একটি রাজ্য। এরাজ্যের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিশেষ গন্তব্যস্থান হল –

কোহিমা

নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমা শ্বাসরুদ্ধকর পাহাড় এবং বন দ্বারা বেষ্টিত নাগাল্যান্ডের একটি অন্যতম ভ্রমণ স্থান। এই স্থানে ট্রেকিং, হাইকিং এবং ক্যাম্পিংয়ের মতো অ্যাডভেঞ্চারগুলি করা যেতে পারে। এই জায়গাটির প্রধান আকর্ষণ হিসাবে রয়েছে কোহিমা ওয়ার সিমেট্রি, জাপফু পিক, জুকোউ ভ্যালি এবং নাগা হেরিটেজ ভিলেজ।

ডিমাপুর

প্রাকৃতিক এবং ঐতিহাসিক নানান পটভুমিতে ঘেরা নাগাল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্থান হল ডিমাপুর। এই জায়গাটির প্রধান আকর্ষণ হল কাচারি ধ্বংসাবশেষ, ডিজেফে ক্র্যাফ্ট ভিলেজ, রাঙ্গাপাহাড় রিজার্ভ ফরেস্ট, ডিমাপুর এও ব্যাস্টিস্ট চার্চ ইত্যাদি।

মোকোকচুং

কোহিমা এবং ডিমাপুরের পরে নাগাল্যান্ডের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নগর কেন্দ্র এবং একটি বিশেষ গন্তব্যস্থান হল মোকোকচুং। মনোমুগ্ধকর পাহাড় এবং স্রোতের সৌন্দর্যে ঘেরা এই জায়গাটির জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলির মধ্যে রয়েছে মোকোকচুং গ্রাম এবং পার্ক, উংমা গ্রাম, আও গ্রাম ইত্যাদি।

ফেক

উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতে সমৃদ্ধ একটি পাহাড়ি এলাকা হল ফেক। স্পেল বাউন্ডিং পাহাড় ছাড়াও শিলোই হ্রদ এই জায়গার একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ।

এছাড়াও, এই জায়গাটির জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলির মধ্যে রয়েছে –

      • ফেক জলপ্রপাত,
      • গ্লোরি পিক,
      • খেজাকেনো গ্রাম ইত্যাদি।

পরিশেষে বলা যায় নাগাল্যান্ড রাজ্যটি তার বৈচিত্র্যময় নানান প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুনে হয়ে উঠেছে ভারতের এক মনোমুগ্ধকর এবং রহস্যময় রাজ্য।

ভিডিও


নাগাল্যান্ড (NAGALAND) – ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় | Explanation of Nagaland State in Bengali

আরো ভিডিও দেখুন

(Explanation of Nagaland State in Bengali)

Gobin
Gobinhttps://bengalknowledge24.com/
I am a Content Creator on YouTube, Facebook, Instagram and Bengal Knowledge 24 Website.

আরও পড়ুন

আপনার জন্য বিশেষ নিবন্ধ