Explanation of Mizoram State in Bengali
পাহাড়-উপত্যকা-নদী-হ্রদ-বনজঙ্গল প্রভৃতির সংমিশ্রণে তৈরি প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্যের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধন স্বতন্ত্রভাবে নিজের পরিচয় দিয়ে যায়, যাকে বলা হয়ে থাকে মিজোদের দেশ। ভারতের রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সিরিজের এই পর্বে চলুন জেনে নেওয়া যাক ভারতের রাজ্য মিজোরাম সম্পর্কে –
মিজোরাম রাজ্য (Mizoram State)
মানচিত্র
Map of Mizoram State


অবস্থান
ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হল মিজোরাম। যার দক্ষিণ অংশটি মায়ানমার ও বাংলাদেশের সাথে ৭২২ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমানা ভাগ করে নিয়েছে এবং উত্তর অংশটি ভারতের মণিপুর, আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে অভ্যন্তরীণ সীমানা দ্বারা সংযুক্ত।
আয়তন ও জনসংখ্যা
আয়তনে ভারতের পঞ্চম ক্ষুদ্রতম রাজ্য মিজোরামের মোট আয়তন ২১,০৮৭ বর্গকিলোমিটার এবং মোট জনসংখ্যা ১০,৯১,০১৪ জন, যা জনসংখ্যার বিচারে ভারতের রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মধ্যে ২৭তম রাজ্য।
২০১১ সালের আদমশুমারির বিবরণ অনুসারে, মিজোরামের জনসংখ্যার তথ্য –
Population data of Mizoram state 2011
প্রকৃত জনসংখ্যা | ১,০৯৭,২০৬ জন |
পুরুষ | ৫৫৫,৩৩৯ জন |
মহিলা | ৫৪১,৮৬৭ জন |
জনসংখ্যা বৃদ্ধি | ২৩.৪৮% |
মোট জনসংখ্যার শতাংশ | ০.০৯% |
লিঙ্গ অনুপাত | ৯৭৬ |
শিশু লিঙ্গ অনুপাত | ৯৭০ |
ঘনত্ব/বর্গ কিমি | ৫২ |
এলাকা (বর্গ কিমি) | ২১,০৮১ |
মোট শিশু জনসংখ্যা (০-৬ বয়স) | ১৬৮,৫৩১ জন |
সাক্ষরতা | ৯১.৩৩% |
পুরুষ সাক্ষরতা | ৯৩.৩৫% |
মহিলা সাক্ষরতা | ৮৯.২৭% |
নামকরণ
তথ্যানুযায়ী, ‘মিজোরাম’ শব্দটি দুটি মিজো শব্দ ‘মিজো’ এবং ‘রাম’ থেকে এসেছে। ‘মিজো’ নামটি স্থানীয় বাসিন্দাদের ডাকতে ব্যবহৃত হয় এবং ‘রাম’-এর অর্থ ভূমি। সুতরাং ‘মিজোরাম’ মানে ‘মিজোদের ভূমি’।
ইতিহাস
উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য উপজাতির মতোই মিজোদের উৎপত্তিও রহস্যময়। গৃহিত ধারণা থেকে জানা যায় তারা মায়ানমারের একটা অংশ এবং চায়না থেকে বার্মা যাওয়া লোকজনই মূলত মিজো। মিজোরা যাযাবরদের ন্যায় নতুন নতুন স্থানে গমন করার ফলে অন্যান্য প্রতিবেশী উপজাতিদের সাথে তাদের দ্বন্দসংঘাত লেগেই থাকত। তাই তারা ১৫ শতকের শেষ দিকে সামাজিক উন্নয়ন ও শৃঙ্খলার জন্য গ্রাম্য প্রশাসন ব্যবস্থা চালু করে একজনকে গোত্র প্রধান মনোনীত করে এবং শুরু হয় তাদের নিয়মিত জীবনযাপন। তবে এরপর ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা চালু হলে প্রায় সবরকমের নিয়মরীতি পাল্টে যায়। ফলে ব্রিটিশদের সব অত্যাচরিত নিয়মরীতির বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যেই মিজো নেতারা বিভিন্ন যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে ওঠেন।
সব কিছু পেরিয়ে বহু বছর পর ভারত স্বাধীনতা লাভ করে এবং মিজোদের এই অঞ্চল ভারতের আসাম রাজ্যের সাথে যুক্ত হয়। তবে মিজোরা তাদের ভূমিকে আলাদা এক স্বতন্ত্র দেশে রূপান্তরিত করতে বহু আন্দোলনে নিজেদের সামিল করে তোলে। পরিশেষে, ভারত সরকার ১৯৭১ সালে মিজো পাহাড়কে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে তা কার্যকরী হয় ১৯৭২ সালের ২১ শে জানুয়ারি এবং এই দিনই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসাবে এই অঞ্চলের নাম হয় মিজোরাম। এরপর ১৯৮৭ সালের ২০ই ফেব্রুয়ারি মিজোরাম ভারতের একটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
প্রশাসনিক বিভাগ
রাজধানী : উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম একটি রাজ্য এই মিজোরামের রাজধানী হল আইজল।
জেলা : প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে মিজোরামকে ১১টি জেলায় বিভক্ত করা হয়েছে। এগুলি হল –
List of distrits in Mizoram state
জেলা | সদর দপ্তর | জনসংখ্যা | আয়তন (বর্গ কিমি) |
আইজল | আইজল | ৪,০৪,০৫৪ | ৩,৫৭৭ |
কোলাসিব | কোলাসিব | ৮৩,০৫৪ | ১,৩৮৬ |
চাম্ফাই | চাম্ফাই | ১,২৫,৩৭০ | ৩,১৬৮ |
মামিত | মামিত | ৮৫,৭৫৭ | ২,৯৬৭ |
লংৎলাই | লংৎলাই | ১,১৭,৪৪৪ | ২,৫১৯ |
লুংলেই | লুংলেই | ১,৫৪,০৯৪ | ৪,৫৭২ |
সাইহা | সাইহা | ৫৬,৩৬৬ | ১,৪১৪ |
সেরছিপ | সেরছিপ | ৬৪,৮৭৫ | ১,৪২৪ |
খজল | খজল | – | – |
সাইতুয়াল | সাইতুয়াল | – | – |
হাঁথিয়াল | হাঁথিয়াল | – | – |
সরকার ও রাজনীতি
মিজোরামের আইনসভা ৪০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত এককক্ষবিশিষ্ট, যা মিজোরাম বিধানসভা নামে পরিচিত। এছাড়াও এই রাজ্যে রাজ্যসভা এবং লোকসভার জন্য ১টি করে সংসদীয় আসন রয়েছে। বিচার ব্যবস্থার দিক থেকে মিজোরাম রাজ্যটি গৌহাটি হাইকোর্টের এক্তিয়ারভূক্ত এবং গৌহাটি হাইকোর্টের আইজল বেঞ্জ দ্বারা এই রাজ্যের বিচার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয়।
প্রধান শহর
রাজ্যের রাজধানীর পাশাপাশি আইজল হল মিজোরামের বৃহত্তম শহর।
রাজ্য প্রতীক
রাজ্যপ্রতীক হিসাবে মিজোরাম রাজ্যের –
State symbols of Mizoram state
রাজ্য পশু | হিমালয়ান সেরো (Himalayan Serow) | ![]() |
রাজ্য পাখি | হিউমের মুরগি (Mrs. Hume’s Pheasant) | ![]() |
রাজ্য মাছ | বার্মিজ কিংফিশ (Burmese Kingfish) | ![]() |
রাজ্য গাছ | নাগেশ্বর (Indian Rose Chestnut) | ![]() |
রাজ্য ফুল | লাল রাস্না (Red Vanda) | ![]() |
ভূপ্রকৃতি
মিজোরাম হল উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি স্থলবেষ্টিত রাজ্য, যাকে বলা যেতে পারে পাহাড়, উপত্যকা হ্রদ ও নদীর দেশ। রাজ্যের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ জুড়ে ২১টি বড় বড় পাহাড়শ্রেণী ও বিভিন্ন উচ্চতার চূড়া রয়েছে এবং বিভিন্ন পাহাড়শ্রেণীর ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মধ্যে দু-এক ফালি সমতল ভূমিরও দেখা পাওয়া যায়।
রাজ্যের পশ্চিম দিকের পাহাড়গুলোর গড় উচ্চতা প্রায় ১০০০ মিটার, যা পূর্ব দিকে ক্রমশঃ ১৩০০ মিটার পর্যন্ত উঠে গেছে। তবে কিছু কিছু অঞ্চলে আরও উঁচু উঁচু পাহাড়শ্রেণী রয়েছে, যেগুলো উচ্চতায় প্রায় ২০০০ মিটারেরও বেশি। রাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ফাউংপুই (Phawngpui) বা নীল পর্বত মিজোরামের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, যার উচ্চতা ২২১০ মিটার। এছাড়াও মিজোরাম রাজ্যটিতে ছোট বড়ো অনেক উপত্যকা রয়েছে। ভানতাং জলপ্রপাত মিজোরামের সর্বোচ্চ এবং সবচেয়ে সুন্দর জলপ্রপাত।
মিজোরাম সিসমিক জোন V (Five) এ অবস্থিত, এর অর্থ ভারতের অন্যান্য অংশের তুলনায় এই রাজ্যটিতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
নদনদী ও হ্রদ
মিজোরামের বৃহত্তম নদী হল ছিমতুইপুই, যা কালাদান নামেও পরিচিত। এছাড়াও আরো অনেক নদী এবং স্রোত মিজোরামের পাহাড়ী শ্রেণীগুলিকে নিষ্কাশন করে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য নদীগুলি হল তলাং, তুত, তুইরিয়াল এবং টুইভাল।
সাইহা জেলায় অবস্থিত পালক হ্রদটি হল মিজোরামের বৃহত্তম হ্রদ, যা ৭৪ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। এছাড়াও তাম দিল হ্রদ মিজোরামের আর একটি উল্লেখযোগ্য হ্রদ।
জলবায়ু
মিজোরাম রাজ্যে মৃদু জলবায়ু বিরাজমান করে। গ্রীষ্মকালে এই রাজ্যের তাপমাত্রা ২০ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে থাকে এবং শীতকালে তাপমাত্রা হয় ৭ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অঞ্চলটি মৌসুমী বায়ু দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে সামান্য বৃষ্টির পাশাপাশি ভারী বৃষ্টিপাতও হয়ে থাকে। এই রাজ্যের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমান ২১৬১ মিমি।
উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত
মিজোরাম অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভিদ, পাখি এবং বন্যপ্রাণীর আবাস্থল। ২০১১ সালের ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া অনুসারে, ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে মিজোরামে সবচেয়ে বেশি শতাংশ এলাকা বনাঞ্চল দ্বারা আচ্ছাদিত। গ্রীষ্মমন্ডলীয় অধা-চিরসবুজ, গ্রীষ্মমন্ডলীয় আর্দ্র পর্ণমোচী, উপ-ক্রান্তীয় চওড়া পাতার পাহাড় এবং উপ-ক্রান্তীয় পাইন বন হল মিজোরামে পাওয়া সবচেয়ে সাধারন গাছপালা।
উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলির মতোই মিজোরামেও বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী পরিলক্ষিত হয়। যেমন ধীর লরিস, লাল সেরো, গরাল, বাঘ, চিতা, মেঘলা চিতা, বাংলা খেঁকশিয়াল, এশীয় কালো ভাল্লুক ইত্যাদি। এছাড়াও এই রাজ্যে প্রায় ৬৪০ প্রজাতির পাখি চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে বেশিরভাগই হিমালয় পাদদেশ এবং দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় প্রজাতি।
মিজোরাম রাজ্যে ৬টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং ২টি জাতীয় উদ্যান রয়েছে। বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যগুলি হল দাম্পা টাইগার রিজার্ভ, লেংটেং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, এনগেংপুই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, তাউই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, খাওংলুং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও থোরাংটুলং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং জাতীয় উদ্যান দুটি হল ব্লু মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্ক ও মুরলেন ন্যাশনাল পার্ক।
অর্থনীতি
মিজোরাম রাজ্যের অর্থনীতির প্রধান উৎস কৃষি এবং শিল্প। ২০১৩ সালের হিসাবে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মতে, মিজোরাম রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ২০.৪% মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে। আর এর বেশির ভাগই গ্রামীণ দারিদ্র জনসংখ্যা।
কৃষি
মিজোরামের কর্মরত জনসংখ্যার ৫৫% থেকে ৬০% মানুষ কৃষিকাজে নিয়োজিত। এছাড়াও কৃষি ঐতিহ্যগতভাবে মিজোরামের মানুষদের জীবিকা নির্বাহের একটি অন্যতম পেশা। উৎপাদিত ফসলগুলির মধ্যে ধান হল মিজোরামের সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত ফসল এবং বিভিন্ন রকমের ফল হল রাজ্যের দ্বিতীয় সর্বাধিক উৎপাদিত ফসল। এছাড়াও মশলা সহ আরো বিভিন্ন রকমের ফসল এই রাজ্যে চাষ হয়ে থাকে।
বন সম্পদ
মিজোরাম হল ভারতের অন্যতম বাঁশ উৎপাদনকারী রাজ্য। আর এই রাজ্যজুড়ে ২৭ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে, যা ভারতের বাণিজ্যিক বাঁশের ১৪% সরবরাহ করে।
শিল্প
শিল্পের অগ্রগতিতে মিজোরাম রাজ্যটি নানা সমস্যার সম্মুখীনে দাড়িয়ে রয়েছে। এরমধ্যে, পরিবহন অবকাঠামোর অভাব একটি প্রধান সমস্যা। এছাডাও অন্যান্য সমস্যাগুলি হল বিদ্যুতের ঘাটতি, মূলধনের অভাব, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি। এরপরেও মিজোরামের জুয়াংতুই এবং কোলাসিবে দুটি শিল্প এস্টেট রয়েছে।
জাতিগোষ্ঠী
মিজোরামের জনসংখ্যার বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বেশ কয়েকটি জাতিগত উপজাতি নিয়ে গঠিত, যারা সাংস্কৃতিকভাবে বা ভাষাগতভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। এই নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলি সম্মিলিতভাবে মিজো নামে পরিচিত। উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলি ছাড়াও মিজোরামে বাঙালি এবং নেপালিসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীও বসবাস করে।
ভাষা
মিজো এবং ইংরেজি ভাষা হল মিজোরাম রাজ্যের সরকারি ভাষা। মৌখিক পারস্পরিক কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভাষা হল মিজো। তবে শিক্ষা, প্রশাসন, আনুষ্ঠানিকতা এবং রাজ্যপরিচালনার জন্য ইংরেজি ভাষা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও এই রাজ্যে চাকমা, লাখের, ত্রিপুরী, পাওয়ি, পাইটে, বাংলা, হিন্দি ইত্যাদি আরো অন্যান্য ভাষাও প্রচলিত।
ধর্ম
ধর্মগত দিক থেকে মিজোরাম রাজ্যে বসসবাসকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মিজো প্রধানত খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এবং মিজো জনসংখ্যার ৮.৩% বৌদ্ধ ও ৩.৬% হিন্দু ধর্মালম্বী। এছাড়াও রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ১.১% মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং অবশিষ্ট কয়েক হাজার মানুষ শিখ, জৈন ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।
শিক্ষাব্যবস্থা
২০১১ সালের আদমশুমারী অনুসারে মিজোরাম রাজ্যে সক্ষরতার হার ছিল ৯১.৫৮%, যা শিক্ষাগত দিক থেকে ভারতের সমস্ত রাজ্যের মধ্যে মিজোরাম দ্বিতীয় সেরা রাজ্য।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য
বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ঘেরা নানান বৈশিষ্ট্য মিজোরাম রাজ্যকে স্বতন্ত্রভাবে চেনাতে সাহায্য করে। ১৮৯০ এর দশকের শেষের দিকে খ্রিস্টধর্মের আগমনের পর থেকে মিজো উপজাতির সংস্কৃতি এবং এর সামাজিক কাঠামো ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যাপক পরিবর্তন করেছে।
উৎসব
মিজোরামের ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলো প্রায়ই ঝুম চাষের পর্যায়কে ঘিরে উদযাপিত হয়। মিম কুট, ছাপচার কুট এবং পাউল কুট হল মিজোরামে পালিত মিজোদের তিনটি বড়ো উৎসব।
সঙ্গীত ও লোকনৃত্য
মনোরম পরিবেশ ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতিতে ঋদ্ধ মিজোরা জাতি হিসেবে প্রাণবন্ত ও অত্যন্ত মিশুকে। মিজোরা গান করতে যেমন ভালোবাসে তেমনি ভালোবাসে নাচতে। সেই হিসাবে মিজোরাম রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যগুলি হল চিরাউ, খুআল্লাম, চাই ইত্যাদি।
ঐতিহ্যবাহী নিয়ম-রীতি
মিজোরাম রাজ্যে মিজোদের মধ্যে বর্তমানে খ্রিস্টাননীতি চালু হলেও এখনো তাদের নিজস্ব প্রথাগত আইনও বহাল আছে। বর কর্তৃক কনেকে পণ দেওয়ার বিবাহ রীতি মিজো সম্প্রদায়ে এখনো প্রচলিত রয়েছে। এছাড়াও মিজো সম্প্রদায়ে সাধারণত মিজো পুরুষরাই সম্পদের উত্তরাধিকারী হয় তবে পারিবারিক সম্পত্তি পরিবারের ছোট ছেলেই পেয়ে থাকে।
খেলাধুলা
মিজোরামের খেলাধুলা মিজোরামের সংস্কৃতি ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফুটবল, বাস্কেটবল এবং ভলিবল হল মিজোরাম রাজ্যের জনপ্রিয় খেলা।
পরিবহন ব্যবস্থা
পরিবহন ব্যবস্থা হিসাবে মিজোরাম রাজ্যের সড়কপথ যথেষ্ট উন্নত। তবে ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে ভারতের অন্যান্য অংশের সঙ্গে এই রাজ্যের তেমন পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি।
রাজ্যের বৈরাবী রেলওয়ে স্টেশনের সাথে একটি রেল সংযোগ থাকলেও এটি মূলত পণ্য পরিবহণের জন্য। মিজোরামের নিকটতম ব্যবহারিক রেলওয়ে স্টেশন আসামের শিলচরে অবস্থিত, রাজ্যের রাজধানী আইজল থেকে যার দুরত্ব ১৮০ কিলোমিটার। তবে সরাসরি মিজোরাম রাজ্য থেকে ভারতের অন্যান্য প্রান্তের সঙ্গে সংযোগের জন্য একটি ব্রডগেজ রেলওয়ে সংযোগ চালু করার পরিকল্পনা চলছে।
আকাশপথ হিসাবে মিজোরামের একমাত্র বিমানবন্দর লেংপুই বিমানবন্দর, যেখান থেকে বর্তমানে শুধুমাত্র গুয়াহাটি, কলকাতা এবং ইম্ফলের উদ্দেশ্যেই উড়ানে যাত্রা করা যায়।
পর্যটন
নাটকীয় ল্যান্ডস্কেপ এবং মনোরম জলবায়ুর কারণে মিজোরামকে একটি সুন্দর জায়গা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে মিজোরাম তার সকল রূপ পরিদর্শনে সবসময়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রেখেছে। তাই মিজোরামের রূপ পরিদর্শন করতে মিজোরাম রাজ্যের কয়েকটি প্রধান পর্যটন স্থান হল-
আইজল
আইজল হল মিজোরাম রাজ্যের রাজধানী এবং মিজোরামের প্রাচীনতম শহরগুলির মধ্যে একটি। প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্যের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধন এই শহরকে আকর্ষিত করে তোলে। দেখার জায়গা হিসাবে এই শহরের হুমুইফাং, তামদিল লেক, চানমারি এবং হস্তশিল্প যাদুঘর খুবই জনপ্রিয়।
লুংলেই
অদ্ভুত ছোট্ট শহর এই লুংলেই তার প্রাকৃতিক জাঁকজমক এবং মনোরম পরিবেশের জন্য বেশ বিখ্যাত। প্রকৃতি পর্যবেক্ষন ছাড়াও এখানে ট্রেকিং, পাখি দেখা এবং ক্যাম্পিং এর মতো অন্যান্য অ্যাডভেঞ্চার ক্রিয়াকলাপগুলিও করা যেতে পারে।
মমিত
মিজোরামের অন্যতম ট্যুরিস্ট আকর্ষণ হল মমিত। দাম্পা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এখানকার অন্যতম সেরা আকর্ষন।
কোলাসিব
শহর থেকে দূরে জীবন উপভোগ করার জন্য অন্যতম সেরা জায়গা হল কোলাসিব। তলাং নদীর স্ফটিক স্বচ্ছ জল, তমদিল হ্রদ এবং সবুজ পাহাড় এই জায়গার বিশেষ আকর্ষণ।
ভানতাং জলপ্রপাত
ভানতাং জলপ্রপাত হল মিজোরাম রাজ্যের সর্বোচ্চ জলপ্রপাত, যা মিজোরামের দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থান।
এছাড়াও, মিজোরাম রাজ্যের অন্যান্য প্রধান পর্যটন স্থানগুলি হল-
- বেইক
- ফলকন গ্রাম
- ফাউংপুই পিক
- তমদিল লেক
- হুমুইফাং
- মুরলেন ন্যাশনাল পার্ক
- চাম্পাই
- দাম্পা টাইগার রিজার্ভ ইত্যাদি।
পরিশেষে বলা যায় মিজোরাম সত্যিই তার প্রাকৃতিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুণে সকল মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। এছাড়াও, এখানকার প্রধান জনজাতি মিজো তাদের ব্যবহার, আচার-আচরন, সততা ইত্যাদি নানান দিক থেকেই প্রশংসনীয়।
ভিডিও
মিজোরাম (MIZORAM) – ভারতের মিজোরাম রাজ্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় | Explanation of Mizoram State in Bengali
আরো ভিডিও দেখুন
(Explanation of Mizoram State in Bengali)