Explanation of Manipur State in Bengali
প্রাকৃতিক মনোরম সৌন্দর্য্যের অনন্য অধিকারী এবং নানান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ভরপুর ভারতের একটি অন্যতম ভিন্ন রাজ্য, যার সংস্কৃতি ও শিল্পকলা বিশ্বজুড়ে সুবিখ্যাত এবং যেখানে জন্ম হয়েছিল আধুনিক পোলো খেলা, যাকে বলা হয়ে থাকে ভারতের রত্নভূমি। ভারতের রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি, চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক ভারতের রাজ্য মণিপুর সম্পর্কে –
মণিপুর রাজ্য
Manipur State
অবস্থান
ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হল মণিপুর। যার উত্তর সীমান্তে রয়েছে ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্য, দক্ষিণ সীমান্তে রয়েছে মিজোরাম রাজ্য, পশ্চিম সীমান্তে আসাম রাজ্য এবং পূর্ব সীমান্তে রয়েছে মায়ানমার রাষ্ট্র।
মানচিত্র
Map of Manipur State
![]() | ![]() |
মণিপুর রাজ্যের মানচিত্র (Map of Manipur State with districts) | ভারতের মানচিত্রে মণিপুর রাজ্যের অবস্থান (Manipur state in Map of India) |
আয়তন ও জনসংখ্যা
আয়তনে ভারতের ২৩ তম রাজ্য মণিপুর রাজ্যের মোট আয়তন ২২,৩২৭ বর্গকিলোমিটার এবং মোট জনসংখ্যা ২৮,৫৫,৭৯৪ জন, যা জনসংখ্যার বিচারে ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে ২৩তম রাজ্য। রাজ্যের জনঘনত্ব অর্থাৎ প্রতি বর্গকিলোমিটারে এই রাজ্যে ১৩০ জন মানুষ বসবাস করে। এছাড়াও এই রাজ্যের জনসখ্যায় প্রতি ১০০০ জন পুরুষে মহিলা জনসংখ্যা রয়েছে ৯৯২ জন।
২০১১ সালের আদমশুমারির বিবরণ অনুসারে, মণিপুর রাজ্যের জনসংখ্যার তথ্য –
Population data of Manipur state 2011
প্রকৃত জনসংখ্যা | ২,৮৫৫,৭৯৪ জন |
পুরুষ | ১,৪৩৮,৫৮৬ জন |
মহিলা | ১,৪১৭,২০৮ জন |
জনসংখ্যা বৃদ্ধি | ২৪.৫০% |
মোট জনসংখ্যার শতাংশ | ৩০.০২% |
লিঙ্গ অনুপাত | ৯৮৫ |
শিশু লিঙ্গ অনুপাত | ৯৩০ |
ঘনত্ব/বর্গ কিমি | ১২৮ |
এলাকা (বর্গ কিমি) | ২২,৩২৭ |
মোট শিশু জনসংখ্যা (০-৬ বয়স) | ৩৭৫,৩৫৭ জন |
সাক্ষরতা | ৭৬.৯৪% |
পুরুষ সাক্ষরতা | ৮৩.৫৮% |
মহিলা সাক্ষরতা | ৭০.২৬% |
নামকরণ
তথ্যানুযায়ী, মণিপুর শব্দটি দুটি সংস্কৃত শব্দ ‘মণি’ এবং ‘পুরা’ দ্বারা গঠিত। সংস্কৃত ভাষায় ‘মণি’-এর অর্থ ‘রত্ন’ এবং ‘পুরা’-এর অর্থ ‘ভূমি’। সুতরাং ‘মণিপুর’ মানে ‘জহরতপূর্ণ ভূমি’ বা ‘রত্নভূমি’। তবে ঐতিহাসিক গ্রন্থে মণিপুরকে ‘কাংলেইপাক’ বা ‘মিটেইলেইপাক’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইতিহাস
প্রাচীনকালে এই মণিপুর অঞ্চলটি কাংলেইপাক রাজ্য হিসাবে পরিচিত ছিল। পীতাম্বর চারাইরঙবা ছিলেন এই রাজত্বের প্রথম রাজা। ১৮২৪ সালে বার্মার আসাম আক্রমণ থেকে মুক্তি পেতে তৎকালীন মণিপুর রাজ গম্ভীর সিং ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে সাহায্য চাইলে গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম আমহার্স্ট-এর নেতৃত্বে প্রথম অ্যাংলো-বার্মা যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধের পরবর্তীতে মনিপুর ভারতের একটি দেশীয় রাজ্য হিসেবে অঙ্গীভূত হয়।
তবে ১৯৪৭ সালে মনিপুর আলাদা এক স্বাধীন রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু পার্শ্ববর্তী বার্মার দখলদারি মনোভাবে ১৯৪৯ সালে মনিপুরের শেষ রাজা বোধচন্দ্র সিং ভারত অন্তর্ভূক্তির সম্মতিপত্রে সই করেন। এরপর ১৯৫৬ সালে মণিপুর ভারতের একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ২১শে জানুয়ারি মণিপুর ভারতের একটি পূর্ণাঙ্গরাজ্য হিসাবে মর্যাদা লাভ করে।
প্রশাসনিক বিভাগ
রাজধানী : মণিপুর রাজ্যের রাজধানী হল ইম্ফল।
জেলা : মণিপুর রাজ্যটি ১৬টি প্রশাসনিক জেলায় বিভক্ত। এগুলি হল –
District list of Manipur state
জেলা | সদর দপ্তর | জনসংখ্যা | আয়তন (বর্গ কিমি) |
বিষ্ণুপুর জেলা | বিষ্ণুপুর | ২৪০,৩৬৩ | ৪৯৬ |
থৌবাল জেলা | থৌবাল | ৪২০,৫১৭ | ৫১৪ |
পূর্ব ইম্ফল জেলা | পরম্পত | ৪৫২,৬৬১ | ৭১০ |
পশ্চিম ইম্ফল জেলা | লাম্ফেলপাট | ৫১৪,৬৮৩ | ৫১৯ |
সেনাপতি জেলা | সেনাপতি | ৩৫৪,৭৭২ | ৩,২৬৯ |
উখরুল জেলা | উখরুল | ১৮৩,১১৫ | ৪,৫৪৭ |
চান্দেল জেলা | চান্দেল | ১৪৪,০২৮ | ৩,৩১৭ |
চূড়াচাঁদপুর জেলা | চূড়াচাঁদপুর | ২৭১,২৭৪ | ৪,৫৭৪ |
তামেংলং জেলা | তামেংলং | ১৪০,১৪৩ | ৪,৩৯১ |
জিরিবাম জেলা | জিরিবাম | ৪৩,৮১৮ | ২৩২ |
কাংপোকপি জেলা | কাংপোকপি | – | – |
কাকচিং জেলা | কাকচিং | – | – |
তেংনৌপাল জেলা | তেংনৌপাল | – | – |
কামজং জেলা | কামজং | – | – |
নোনি জেলা | নোনি | – | – |
ফেরজল জেলা | ফেরজল | – | – |
সরকার ও রাজনীতি
মণিপুর রাজ্যের আইনসভা ৬০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত এককক্ষবিশিষ্ট, যা মণিপুর বিধানসভা নামে পরিচিত। এছাড়াও এই রাজ্যে রাজ্যসভার জন্য ১টি আসন এবং লোকসভার জন্য ২টি আসন রয়েছে। গৌহাটি হাইকোর্ট দ্বারা এই রাজ্যের বিচার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয়।
শহর
রাজ্যের রাজধানীর পাশাপাশি ইম্ফল হল মণিপুরের বৃহত্তম শহর। এছাড়াও এই রাজ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলি হল উখরুল, থৌবাল, বিষ্ণুপুর, মৈরাং, কাকচিং, ওয়াংজিং, মায়াং ইম্ফল, ইয়াইরিপোক ইত্যাদি।
রাজ্য প্রতীক
মণিপুর রাজ্যের রাজ্য প্রতীকগুলি হল –
State Symbols of Manipur state
রাজ্য পশু | সাংগাই (Sangai) | ![]() |
রাজ্য পাখি | ননজিন (Nongin) | ![]() |
রাজ্য গাছ | ইউনিংথোউ (Uningthou) | ![]() |
রাজ্য ফুল | সিরোই লিলি (Siroi Lily) | ![]() |
রাজ্য মাছ | পেংবা (Pengba) | ![]() |
ভূপ্রকৃতি
মণিপুরের ভূপ্রকৃতি পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী উপত্যকা ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত। নীলপাহাড় দ্বারা বেষ্টিত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই রাজ্যের উচ্চতা ৭৯০ মিটার। রাজ্যের চারিদিকে নানান সবুজ পাহাড় ও উপত্যকা পরিলক্ষিত হয়। রুক্ষ ভূখন্ড থেকে সবুজ সমভূমি, ঘন জঙ্গল থেকে গর্জনকারী জলপ্রপাত এই সবই মণিপুর রাজ্যের ভূপ্রকৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও রাজ্যটিতে একাধিক নদ-নদী প্রবাহিত হয়েছে। রাজ্যটিতে চারটি প্রধান নদী অববাহিকা রয়েছে, পশ্চিমে বরাক নদী অববাহিকা, মধ্য মণিপুরে মণিপুর নদী অববাহিকা, পূর্বে ইউ নদী অববাহিকা এবং উত্তরে ল্যানিয়ে নদী অববাহিকা।
নদনদী ও হ্রদ
মণিপুরের বৃহত্তম নদী বরাক মণিপুর পাহাড়ে উৎপন্ন হয়ে ইরাং, মাকু এবং তুইভাইয়ের মতো উপনদী দ্বারা যুক্ত হয়েছে।
মইরাং-এ অবস্থিত লোকটাক হ্রদ মণিপুর রাজ্যের বৃহত্তম মিষ্টি জলের হ্রদ, যার আয়তন ২৫০ বর্গ কিমি থেকে বর্ষাকালে ৫০০ বর্গ কিমি পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়। বিশ্বের একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যান কেবুল লামজো জাতীয় উদ্যান (Keibul Lamjao National Park) এই হ্রদেই অবস্থিত, যা ৪০ বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত্ব।
জলবায়ু
মণিপুর রাজ্যের জলবায়ু মূলত এই অঞ্চলের ভূসংস্থান দ্বারা প্রভাবিত। রাজ্যটিকে ঘিরে থাকা নয়টি পর্বতশ্রেণী উত্তর থেকে আসা ঠান্ডা বাতাসকে উপত্যকায় পৌঁছাতে বাধা দেয় এবং বঙ্গোপসাগর থেকে আসা ঘূর্ণিঝড়ের প্রতিবন্ধক হিসাবে কাজ করে। প্রায় সারা বছর ধরে এই রাজ্যে নাতিশীতোষ্ণ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ জলবায়ু বিরাজমান করে। তবে শীতকাল কখনও কখনও খুবই ঠান্ডা হয়ে ওঠে।
গ্রীষ্মের মাসগুলিতে রাজ্যের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হয় ৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং শীতকালে তাপমাত্রা প্রায়শই ০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এর নীচে নেমে আসে, যার ফলে রাজ্যের উচ্চতম স্থানগুলিতে কখনও কখনও তুষারপাতও হয়ে থাকে। জানুয়ারি হল রাজ্যের শীতলতম মাস এবং জুলাই হল রাজ্যের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস। রাজ্যে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১,৪৬৭ মিমি।
উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত
মণিপুর রাজ্যের ৬৪ শতাংশ এলাকা বনাঞ্চল দ্বারা আচ্ছাদিত। সম্পূর্ণ রাজ্যজুড়ে চার ধরনের বনাঞ্চল পরিলক্ষিত হয়, যথা – গ্রীষ্মমন্ডলীয় আধা-চিরসবুজ, শুষ্ক নাতিশীতোষ্ণ, উপ-ক্রান্তীয় পাইন এবং ক্রান্তীয় আর্দ্র পর্ণমোচী বনাঞ্চল। সেগুন, পাইন, ওক, আনিংথু, লেইহাও, বাঁশ, বেত ইত্যাদি হল এই রাজ্যের সাধারন গাছপালা। এছাড়াও এই রাজ্য বিভিন্ন ঔষধি উদ্ভিদের আবাসস্থল।
যেকোনো অ্যাডভেঞ্চার প্রেমী বা বন্যপ্রাণী উৎসাহীদের জন্য একটি স্বপ্নের গন্তব্য স্থান হল মণিপুর। বিশ্বের একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যান এবং বহু বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী, সাঙ্গাই হরিণ, মেঘাচ্ছন্ন চিতাবাঘ ও সোনালি বিড়াল মণিপুরের প্রধান আকর্ষণ।
অর্থনীতি
মণিপুর রাজ্যের অর্থনীতির প্রধান উৎস কৃষি এবং শিল্প। তবে এ রাজ্যের শিল্পব্যবস্থা বিশেষ উন্নত নয়। পর্যটন এবং বিভিন্ন হস্তশিল্পই এই রাজ্যের প্রধান শিল্প।
কৃষি
মণিপুরের জলবায়ু এবং মাটি কৃষিকাজে বিশেষ উপযোগী হওয়ায় এরাজ্যে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ হয়ে থাকে এবং এরাজ্যের বেশীরভাগ মানুষই কৃষিজীবী। রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে ঝুমচাষ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়। উৎপাদিত ফসলগুলির মধ্যে এই রাজ্যের প্রধান খাদ্য ফসল হল ধান এবং অর্থকারী ফসল হিসাবে এই রাজ্যে লিচু, কাজু, আখরট, কমলা, লেবু, আনারস, পেঁপে ইত্যাদি চাষ হয়ে থাকে।
বন সম্পদ
মণিপুর রাজ্যটি ৩০০০ বর্গ কিলোমিটার বাঁশের বন দ্বারা আচ্ছাদিত, যা রাজ্যটিকে তার বাঁশ শিল্পে ভারতের বৃহত্তম অবদানকারী রাজ্য হিসাবে পরিণত করেছে।
শিল্প
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মণিপুরেই হস্তশিল্পের একক সবচেয়ে বেশি এবং কারিগরের সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি। মণিপুর হল ভারতের বাঁশের কারুশিল্পের বৃহত্তম উৎপাদক। হস্তশিল্পে এরাজ্যের নিপুণ শৈলী বিশ্ব বিখ্যাত। পুতুল, হাতে তৈরি ঝুড়ি, বাঁশের ছাতা এবং আরো অনেক কিছুই এই রাজ্যে পাওয়া যায়, যার কারুকার্য বিশেষভাবে আকর্ষিত করে।
জাতিগোষ্ঠী
জাতিগত দিক থেকে মণিপুর রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ৫৩ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে মেইতি বা মণিপুরী জনজাতি এবং জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ রয়েছে বিভিন্ন নাগা উপজাতি ও ১৬ শতাংশ রয়েছে বিভিন্ন কুকি/জোমি উপজাতি। এছাড়াও জনসংখ্যার বাকি ৭ শতাংশ রয়েছে নেপালি, বাঙালি তামিল, মারোয়ারি ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী।
ভাষা
মেইতি বা মণিপুরী ভাষা হল মণিপুর রাজ্যের সরকারি ভাষা, যা এই রাজ্যে বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষের কথ্য ভাষা। এছাড়াও এই রাজ্যে থাদু, তাংখুল, বোল, মাও, নেপালি, লিয়াংমাই, কুকি ও বাংলাসহ আরো অন্যান্য ভাষাও প্রচলিত।
ধর্ম
ধর্মগত দিক থেকে মণিপুর রাজ্যে বসসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্ম হল হিন্দু এবং এরপরই খ্রিস্টান ধর্ম। এছাড়াও রাজ্যের জনসংখ্যার অবশিষ্ট মানুষ ইসলাম, সানামাহি, বৌদ্ধ, ইহুদি, শিখ, জৈন ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।
শিক্ষাব্যবস্থা
শিক্ষাগত দিক থেকে মণিপুর রাজ্যের সাক্ষরতার হার ৮০ শতাংশ যা ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে মণিপুর ১৬তম রাজ্য।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ঘেরা মণিপুর-এর নিজস্ব শিল্প-ফর্ম এবং সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি মণিপুরকে বিশ্বের কাছে স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করে। বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত মণিপুরী নৃত্য থেকে শুরু করে মার্শাল আর্টের প্রচীন রূপ থাং তা এবং বিভিন্ন ধরনের লোকনৃত্য ও সঙ্গীত মণিপুরকে নানান ঐতিহ্যে ভরিয়ে তুলেছে।
শিল্প ও সৌন্দর্য্যের প্রতি ভালোবাসা মণিপুরের মানুষদের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গান গাইতে বা নাচতে পারে না এমন মণিপুরী মেয়ে খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন। আসলে মণিপুরীরা প্রকৃতিগতভাবে শৈল্পিক এবং সৃজনশীল। আর এটি তাদের তাঁত এবং হস্তশিল্পের পণ্যগুলিতে খুঁজে পাওয়া যায়, যার ডিজাইন, চাতুর্য রঙিনতা এবং উপযোগিতার জন্য বিশ্ব বিখ্যাত।
লোকনৃত্য
মণিপুরের কয়েকটি বিখ্যাত মণিপুরী নৃত্য হল রাস লীলা, নৃপা পালা, পুং চোলোম, মাইবি নৃত্য ও খাম্বা থোইবি।
উৎসব
মণিপুরকে বলা যেতে পারে উৎসবের দেশ। বছরের প্রায় প্রতি মাসেই মণিপুরবাসী বিভিন্ন উৎসবে মেতে ওঠেন, যা তাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় অনুশীলনকে প্রতিফলিত করে। এই রাজ্যের কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব হল নিঙ্গোল চাকৌবা (Ningol Chakouba), কুট (Kut), ইয়াওসাং (Yaosang), চেইরাওবা (Cheiraoba), গান-নগাই (Gaan-Ngai), সাঙ্গাই ফেস্টিবল (Sangai Festival), শিরুই লিলি ফেস্টিবল (Shirui Lily Festival) ইত্যাদি।
খাবার
খাবারের দিক থেকে মণিপুর বাসিরা মূলত নিরামিষ জাতীয় খাবার খেতেই বেশি পছন্দ করেন। এখানকার খাবার স্থানীয় ভেষজ থেকে সুগন্ধে সমৃদ্ধ এবং বেশিরভাগ ভাজা না করে বাষ্পে রান্না করা হয়। একটি সাধারন মণিপুরি খাবারের থালায় প্রধানত ভাত, সবজি, স্যালাড, মাছ বা মাংসের তরকারি ইত্যাদি থেকে থাকে।
খেলাধুলা
মণিপুর রাজ্য অসংখ্য খেলাধুলার আবাসস্থল। অধুনিক পোলো খেলার জন্মস্থানও এই মণিপুর রাজ্যে। স্থানীয়রা অবশ্য এই খেলাটিকে সাগোল কাংজেই (Sagol Kangjei) বলে ডাকে। আর এই খেলাই মণিপুর রাজ্যের রাষ্ট্রীয় খেলা। হকি, ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলার পাশাপাশি এরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলি হল – মুকনা, যা কুস্তির একটি জনপ্রিয় রূপ; যুবি লাকপি, যার আক্ষরিক অর্থ নারকেল ছিনতাই; উলাওবি, একটি বহিরঙ্গন খেলা যা মূলত মহিলারা খেলেন; হিয়াং তানাবা, একটি ঐতিহ্যবাহী নৌকা রোয়িং রেস ইত্যাদি।
পাঁচবারের বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়ন এবং ছয়টি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ানশিপেই পদকজয়ী একমাত্র মহিলা বক্সার এম সি মেরি কম, যার জন্ম ভারতের এই মণিপুর রাজ্যে। সাইখোম মীরাবাই চানু, যিনি একজন ভারতীয় ভারোত্তোলক এবং টোকিও অলিম্পিকে রৌপ্য পদক বিজয়ী; সুশীলা চানু, যিনি ভারতীয় হকি খেলোয়াড় এবং ভারতীয় জাতীয় মহিলা হকি দলের প্রাক্তন অধিনায়ক; রেনেডি সিং, যিনি একজন প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবল খেলোয়াড় প্রমুখ ব্যক্তি হলেন মণিপুর রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তি বর্গ।
পরিবহন ব্যবস্থা
সড়ক : পরিবহন ব্যবস্থা হিসাবে মণিপুর রাজ্যে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হল সড়কপথ। এই রাজ্যের সড়ক নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ৭,১৪০ কিলোমিটার, যা রাজ্যের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং দূরবর্তী গ্রামগুলিকে সংযুক্ত করে। তবে রাজ্যজুড়ে রাস্তার অবস্থা প্রায়ই শোচনীয়।
রেল : সড়কপথ ছাড়াও মণিপুর রাজ্যে রেলপথ ও আকাশপথেরও ব্যবস্থা রয়েছে। রাজ্যের প্রথম রেলস্টেশন হল জিরিরাম রেলস্টেশন, এছাড়াও রয়েছে ইম্ফল রেলস্টেশন।
বিমান : মণিপুরের একমাত্র বিমানবন্দর ইম্ফল বিমানবন্দর, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর।
পর্যটন
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ঘেরা মণিপুর রাজ্যের কয়েকটি বিখ্যাত গন্তব্য স্থান হল –
লোকটাক লেক (Loktak Lake)
মণিপুরের বিষ্ণুপুর জেলায় অবস্থিত উত্তর-পূর্ব ভারতের বৃহত্তম মিষ্টি জলের হ্রদ হল লোকটাক লেক, যা মণিপুর রাজ্যের একটি অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। এটি একটি নৈসর্গিক এবং রহস্যময় হ্রদ, যা একটি ক্ষুদ্র অন্তর্দেশীয় সমুদ্রের অনুরুপ।
কেইবুল লামজাও ন্যাশনাল পার্ক (Keibul Lamjao National Park)
মণিপুরের বিষ্ণুপুর জেলায় লোকটাক লেক-এ অবস্থিত কেইবুল লামজাও জাতীয় উদ্যান হল বিশ্বের একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যান। পাখিদের স্বর্গ হিসাবে বিবেচিত এই উদ্যান বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ এবং প্রাণিজগৎ দ্বারা সুসমৃদ্ধ।
জুকো ভ্যালি (Dzuko Valley)
মণিপুরের সেনাপতি জেলায় অবস্থিত জুকো ভ্যালি অ্যাডভেঞ্চার প্রেমী এবং ট্রেকারদের জন্য একটি বিখ্যাত পর্যটন স্থান। এই উপত্যকার মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য খুবই মুগ্ধকর।
কাংলা ফোর্ট (Kangla Fort)
ইম্ফল শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কাংলা ফোর্ট মণিপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। দূর্গের লোভনীয় সৌন্দর্য এবং চারপাশের নাটকীয় শৈলী এই স্থানটিকে পর্যটকদের কাছে একটি প্রধান গন্তব্য করে তুলেছে।
এমা মার্কেট (Ema Market)
ইম্ফল শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো এমা মার্কেট বিশ্বের একমাত্র বাজার যেখানে সমস্ত বিক্রেতাই মহিলা। প্রতিদিন ৩০০০ জনেরও বেশি মহিলা এখানে তাদের পণ্যসামগ্রী বিক্রি করেন। ফলে মণিপুরের সেরা কেনাকাটার গন্তব্য হিসাবে এই স্থানটি খুবই অনুপ্রেরণাদায়ক এবং আকর্ষণীয়।
শ্রী শ্রী গোবিন্দজি মন্দির (Shree Shree Govindaji Temple)
ইম্ফল শহরের মধ্যে অবস্থিত শ্রী শ্রী গোবিন্দজি মন্দির মণিপুরের বৈষ্ণবদের একটি ঐতিহাসিক কেন্দ্র।
এছাড়াও অন্যান্য বিখ্যাত গন্তব্য স্থানগুলি হল –
- শিরুই হিলস্ (Shirui Hills)
- খাংখুই চুনের গুহা (Khangkhui Lime Caves)
- থারন গুহা (Tharon Cave)
- জিলাদ লেক (Zeilad Lake)
- ফাংগ্রেই (Phangrei)
- খংজম ওয়ার মেমোরিয়াল (Khongjom War Memorial)
- রেড হিল অ্যান্ড ইন্ডিয়া পিস মেমোরিয়াল (Red Hill & India Peace Memorial),
- শ্রী গোপীনাথ মন্দির (Shri Gopinath Temple)
- মুতুয়া মিউজিয়াম (Mutua Museum) ইত্যাদি।
ভিডিও
মণিপুর রাজ্য (Manipur State) – ভারতের মণিপুর রাজ্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় | Explanation of Manipur State in Bengali
আরো ভিডিও দেখুন
(Explanation of Manipur State in Bengali)