About Arunachal Pradesh State in Bengali
বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের অন্যতম নিদর্শন এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ভারতের এক ভিন্ন রাজ্য, যাকে বলা হয় ভারতের উদীয়মান সূর্যের দেশ। ভারতের রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক ভারতের রাজ্য অরুনাচল প্রদেশ সম্পর্কে –
অরুনাচল প্রদেশ রাজ্য
Arunachal Pradesh State, India
অবস্থান
ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হল অরুনাচল প্রদেশ। যার দক্ষিন সীমান্তে রয়েছে ভারতের আসাম ও নাগাল্যান্ড রাজ্য, উত্তরে রয়েছে চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সাথে একটি বিতর্কিত ১,১২৯ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্ত, পশ্চিমে রয়েছে ভূটান রাষ্ট্র ও পূর্বে রয়েছে মায়ানমার রাষ্ট্র।
মানচিত্র
Map of Arunachal Pradesh State
![]() | ![]() |
অরুনাচল প্রদেশ রাজ্যের মানচিত্র (Map of Arunachal Pradesh State with districts) | ভারতের মানচিত্রে অরুনাচল প্রদেশ রাজ্যের অবস্থান (Arunachal Pradesh state in Map of India) |
আয়তন
উত্তর-পূর্ব ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলির মধ্যে আয়তনে বৃহত্তম রাজ্য অরুনাচল প্রদেশের মোট আয়তন ৮৩,৭৪৩ বর্গকিলোমিটার।
জনসংখ্যা
অরুনাচল প্রদেশের মোট জনসংখ্যা ১৩,৮৩,৭২৭ জন, যা জনসংখ্যার বিচারে ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে ২৬তম রাজ্য। রাজ্যের জনঘনত্ব অর্থাৎ প্রতি বর্গকিলোমিটারে এরাজ্যে মাত্র ১৭ জন মানুষ বসবাস করে, যা দেশের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এরাজ্যের জনসংখ্যার জনঘনত্ব সবচেয়ে কম।
২০১১ সালের আদমশুমারির বিবরণ অনুসারে, অরুনাচল প্রদেশ রাজ্যের জনসংখ্যার তথ্য –
Population data of Arunachal Pradesh state 2011
প্রকৃত জনসংখ্যা | ১,৩৮৩,৭২৭ জন |
পুরুষ | ৭১৩,৯১২ জন |
মহিলা | ৬৬৯,৮১৫ জন |
জনসংখ্যা বৃদ্ধি | ২৬.০৩% |
মোট জনসংখ্যার শতাংশ | ০.১১% |
লিঙ্গ অনুপাত | ৯৩৮ |
শিশু লিঙ্গ অনুপাত | ৯৭২ |
ঘনত্ব/বর্গ কিমি | ১৭ |
এলাকা (বর্গ কিমি) | ৮৩,৭৪৩ |
মোট শিশু জনসংখ্যা (০-৬ বয়স) | ২১২,১৮৮ জন |
সাক্ষরতা | ৬৫.৩৮% |
পুরুষ সাক্ষরতা | ৭২.৫৫% |
মহিলা সাক্ষরতা | ৫৭.৭০% |
নামকরণ
অরুনাচল প্রদেশ রাজ্যটির নামকরণে, ‘অরুনাচল প্রদেশ’ শব্দটির অর্থ হল ‘ভোর, আলো ও পাহাড়ের দেশ’।
ইতিহাস
ইতিহাস অনুযায়ী, কালিকা পুরাণ এবং মহান হিন্দুমহাকাব্য মহাভারতে অরুণাচল প্রদেশ অঞ্চলটির উল্লেখ পাওয়া যায়। হিন্দু পৌরাণিক কিংবদন্তি অনুসারে, অরুণাচল প্রদেশ ছিল সেই স্থান যেখানে ঋষি পরশুরাম তার পাপ ধুয়ে দিয়েছিলেন, ঋষি বেদব্যাস ধ্যান করেছিলেন, রাজা ভীষ্মক তাঁর রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর স্ত্রী রুক্মিণীকে বিয়ে করেছিলেন। সে সময় অনেক শক্তিশালী রাজবংশ এবং রাজ্য দ্বারা শাসিত হয়েছিল অরুণাচল প্রদেশ অঞ্চলটি।
এরপর, ১৬শ শতকের দিকে অসমের রাজারা অরুণাচল প্রদেশ অঞ্চলটির বেশ কিছু অংশ দখল করতে শুরু করে। তবে পরবর্তীতে ১৮২৬ সালে অসম নিজেই ব্রিটিশ ভারতের দখলে চলে যায় এবং ১৯১২ সালে অরুনাচল প্রদেশ অঞ্চলটিকেও নর্থ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার ট্র্যাক্ট (North Eastern Frontier Tract – NEFT) নামে প্রশাসনিক অঞ্চল হিসাবে অসমের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ১৯৫৪ সালে অবশ্য এই নাম বদলে রাখা হয় নর্থ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি (North Eastern Frontier Agency)।
১৯১৩ সাল থেকে উত্তরে তিব্বতের সীমান্ত নিয়ে শুরু হয় নানান বিবাদ। ব্রিটিশরা হিমালয়ের শীর্ষরেখাকে সীমান্ত হিসেবে প্রস্তাব করে। আর এই প্রস্তাবিত রেখাটি ম্যাকমাহোন রেখা (McMahon Line) নামে পরিচিত এবং বর্তমানে এই রেখাটিই কার্যত ভারত-চীন সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু সে সময় চীনারা এই প্রস্তাব মানতে রাজি হয় না।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতার পর চীন প্রায় সম্পূর্ণ অরুণাচল প্রদেশ অঞ্চলটিকে তাদের নিজের বলে দাবী করে। ফলে ১৯৫৯ ও ১৯৬২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে চীনা সেনারা বেশ কয়েকবার ম্যাকমাহোন রেখা অতিক্রম করে এবং সাময়িকভাবে ভারতের সীমান্ত ঘাঁটিগুলি দখল করে। তবে ১৯৬২ সালে চীন অরুণাচল প্রদেশ অঞ্চল থেকে সরে আসে। এরপর ১৯৭২ সালের ২১শে জানুয়ারি নর্থ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি নামক অরুণাচল প্রদেশ অঞ্চলটি অরুণাচল প্রদেশ নামে ভারতের একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালের ২০ই ফেব্রুয়ারি অরুণাচল প্রদেশ ভারতের একটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা পায়।
প্রশাসনিক বিভাগ
রাজধানী
উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম একটি রাজ্য এই অরুণাচল প্রদেশের রাজধানী হল ইটানগর।
জেলা
অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যটিতে সর্বমোট ২৮টি জেলা রয়েছে। পশ্চিম সিয়াং হল আয়তনের দিক থেকে এই রাজ্যের সর্ববৃহৎ জেলা এবং তাওয়াং হল সবচেয়ে ছোট জেলা। এছাড়া জনসংখ্যার দিক থেকে পাপুম জেলাটি হল এরাজ্যের বৃহত্তম জেলা এবং দিওয়াং উপত্যকা হল সবচেয়ে ছোট জেলা। অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যের ২৮টি জেলা হল –
District list of Arunachal Pradesh state
জেলা | সদর দপ্তর | জনসংখ্যা (২০১১ জনগণনা) | আয়তন (বর্গ কিমি) |
তওয়াং জেলা | তওয়াং টাউন | ৪৯,৯৫০ | ২,০৮৫ |
পশ্চিম কামেং জেলা | বোমডিলা | ৮৭,০১৩ | ৭,৪৪২ |
বিচম জেলা | নাপাংফুং | ৯,৭১০ | ২,৮৯৭ |
পূর্ব কামেং জেলা | সেপ্পা | ৭৮,৪১৩ | ৪,১৩৪ |
পাক্কে কেসাং জেলা | লেম্মি | ১৫,৩৫৮ | ১,৯৩২ |
কুরুং কুমে জেলা | কলোরিয়াং | ৮৯,৭১৭ | ৮,৮১৮ |
পাপুম পারে জেলা | ইউপিয়া | ১৭৬,৩৮৫ | ২,৮৭৫ |
ক্রা দাদি জেলা | জমিন | ২২,২৯০ | ২,২০২ |
নিম্ন সুবনসিরি জেলা | জিরো | ৮২,৮৩৯ | ৩,৪৬০ |
কামলে জেলা | রাগা | ২২,২৫৬ | ২০০ |
কেয়ি পানীয়র জেলা | ইয়াচুলি | ৩০,০০০ | – |
উচ্চ সুবনসিরি জেলা | দপোরিজো | ৮৩,২০৫ | ৭,০৩২ |
শি ইয়োমি জেলা | তাতো | ১৩,৩১০ | ২,৮৭৫ |
পশ্চিম সিয়াং জেলা | আলং | ১১২,২৭২ | ৮,৩২৫ |
সিয়াং জেলা | বোলেং | ৩১,৯২০ | ২,৯১৯ |
নিম্ন সিয়াং জেলা | লিকাবালি | ২২,৬৩০ | – |
উচ্চ সিয়াং জেলা | ইংকিয়ং | ৩৩,১৪৬ | ৬,১৮৮ |
লেপা রাদা জেলা | বাসার | ১৪,৪৯০ | – |
পূর্ব সিয়াং জেলা | পাসিঘাট | ৯৯,০১৯ | ৪,০০৫ |
উচ্চ দিবাং উপত্যকা জেলা | আনিনি | ৭,৯৪৮ | ৯,১২৯ |
নিম্ন দিবাং উপত্যকা জেলা | রইং | ৫৩,৯৮৬ | ৩,৯০০ |
লোহিত জেলা | তেজু | ১৪৫,৫৩৮ | ২,৪০২ |
অনজো জেলা | হাওয়াই | ২১,০৮৯ | ৬,১৯০ |
নামসাই জেলা | নামসাই | ৯৫,৯৫০ | ১,৫৮৭ |
চংলং জেলা | চংলং | ১৪৭,৯৫১ | ৪,৬৬২ |
তিরপ জেলা | খোনসা | ১১১,৯৯৭ | ২,৩৬২ |
লংডিং জেলা | লংডিং | ৬০,০০০ | ১,২০০ |
ইটানগর ক্যাপিটাল কমপ্লেক্স জেলা | ইটানগর | ১২২,৯৩০ | ২০০ |
আইনসভা
৬০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত অরুণাচল প্রদেশের আইনসভা এককক্ষবিশিষ্ট, যা অরুণাচল প্রদেশ বিধানসভা নামে পরিচিত। এছাড়াও এই রাজ্যে ভারতের জাতীয় আইনসভার নিম্নকক্ষ লোকসভায় ২টি আসন এবং উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় ১টি আসন রয়েছে।
বিচার ব্যবস্থা
বিচার ব্যবস্থার দিক থেকে অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যটি গৌহাটি হাইকোর্টের এক্তিয়ারভূক্ত এবং গৌহাটি হাইকোর্টের ইটানগর বেঞ্জ দ্বারা এই রাজ্যের বিচার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয়।
রাজ্য প্রতীক
অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যের রাজ্য প্রতীকগুলি হল –
State Symbols of Arunachal Pradesh state
রাজ্য সিলমোহর | অরুণাচল প্রদেশের প্রতীক | ![]() |
রাজ্য নীতিবাক্য | সত্যমেব জয়তে | |
রাজ্য পশু | মিথুন বা গয়াল (Mithun) | ![]() |
রাজ্য পাখি | রাজ ধনেশ (Great Indian Hornbill) | ![]() |
রাজ্য গাছ | হলং (Hollong) | ![]() |
রাজ্য ফুল | কর্পো বা শেয়াললেজী অর্কিড (Foxtail orchid) | ![]() |
রাজ্য মাছ | সোনালি মহাশোল (Golden Mahseer) | ![]() |
শহর
রাজ্যের রাজধানীর পাশাপাশি ইটানগর হল অরুণাচল প্রদেশের বৃহত্তম শহর। এছাড়াও অন্যান্য প্রধান শহরগুলি হল –
- পাসিঘাট (Pasighat),
- নামসাই (Namsai),
- তাওয়াং (Tawang),
- আলং (Along),
- তেজু (Tezu),
- জিরো (Ziro) ইত্যাদি।
ভূপ্রকৃতি
‘ভোরের আলো-পর্বতের ভূমি’ (‘Land of Dawn-Lit Mountains’) নামে পরিচিত অরুণাচল প্রদেশ হল ভারতের এক প্রত্যন্ত রাজ্য এবং উদীয়মান সূর্যকে অভ্যর্থনা জানানো প্রথম ভারতীয় মাটি। ভারতে প্রতিদিন সর্বপ্রথম সূর্য্যের আলোয় আলোকিত হওয়া অরুণাচল প্রদেশ রাজ্য জুড়ে রয়েছে সবুজ বন, গভীর নদী, উপত্যকা, বিশাল পাহাড় এবং সুন্দর মালভূমি।
এই রাজ্যের ভূপ্রকৃতি দক্ষিণে পাহাড়ের পাদদেশীয় এলাকা দিয়ে শুরু হয়ে ক্ষুদ্রতর হিমালয় পর্বতমালায় উপনীত হয়েছে এবং সেখান থেকে উত্তরে তিব্বতের সাথে সীমান্তের কাছে বৃহত্তর হিমালয় পর্বতমালার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ৭০৯০ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট কাংটো (Kangto) হল এই রাজ্যের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। এছাড়াও নেগি কাংসা (Nyegi Kangsang), প্রধান গোরিচেন (The main Gorichen) এবং পূর্ব গোরিচেন (Eastern Gorichen) হল এই রাজ্যের অন্যান্য উঁচু হিমালয় পর্বতশৃঙ্গ। কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়, ঝলমলে নদী, ঝরঝর ঝর্ণা ইত্যাদি হল অরুণাচল প্রদেশের ভূপ্রকৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
নদনদী ও হ্রদ
সিয়াং (Siang) নামে পরিচিত ব্রহ্মাপুত্র নদ এবং তার বিভিন্ন উপনদী কামেং (Kameng), সুবানসিরি (Subansiri), দিবাং (Dibang), লোহিত (Lohit) ও নোয়া দিহিং (Noa Dihing) হল অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যের প্রধান নদ-নদী।
জলবায়ু
অরুণাচল প্রদেশের আবহাওয়া এবং জলবায়ু দেশের অন্যান্য অংশ থেকে বেশ আলাদা। এই রাজ্যের জলবায়ু হিমালয় প্রণালী এবং উচ্চতাগত তারতম্য দ্বারা প্রভাবিত। নিম্ন উচ্চতাবিশিষ্ট অঞ্চল এবং জলাবদ্ধ ঘন বন দ্বারা আচ্ছাদিত উপত্যকায় বিশেষ করে এই রাজ্যের পূর্ব অংশে জলবায়ু অত্যন্ত উষ্ণ এবং আর্দ্র স্বভাবের, তবে এই রাজ্যের উচ্চতম স্থানগুলির তাপমাত্রা খুবই কম।
এই রাজ্যে বছরে ২০০০ থেকে ৫০০০ মিলিমিটার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে, ফলে এই রাজ্য হয়ে উঠেছে দেশের সর্বোচ্চ ভারী বৃষ্টিপাত হওয়া রাজ্যগুলির মধ্যে একটি।
উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত
অরুণাচল প্রদেশে বৈচিত্র্যময় নানান প্রজাতির উদ্ভিদ, পাখি এবং বন্যপ্রাণী দেখা যায়। এই রাজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চল বনভূমি দ্বারা আচ্ছাদিত। হিমালয়ের পাদদেশ এবং পাটকাই পাহাড়সহ রাজ্যের বেশীরভাগ অংশই পূর্ব হিমালয়ের চওড়া পাতার বনের আবাস্থল। এই রাজ্যের বনাঞ্চলে নানান ঔষধি উদ্ভিদও রয়েছে। বিশাল আকারের গাছ, প্রচুর লতা, বেত এবং বাঁশ রাজ্যটিকে চিরহরিৎ করে তুলেছে।
অরুণাচল প্রদেশ ভারতের একমাত্র রাজ্য যেখানে ৫০০টিরও বেশি বিরল প্রজাতির অর্কিড পাওয়া যায়। রাজ্যটিতে ১টি অর্কিড অভয়ারণ্য, ২টি জাতীয় উদ্যান এবং ৮টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রয়েছে। মৌলিং ন্যাশনাল পার্ক (Mouling National Park) এবং নামদাফা ন্যাশনাল পার্ক (Namdapha National Park) হল এরাজ্যের দুটি জাতীয় উদ্যান।
অরুনাচল প্রদেশ রাজ্যটিতে ৭৫০টি প্রজাতির পাখি এবং ২০০টিরও বেশি প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। এই রাজ্যের প্রধান বন্যপ্রাণীগুলি হল বাঘ, চিতাবাঘ, তুষার চিতা, এশিয়ান হাতি, সাম্বার হরিণ, চিতল হরিণ, ভারতীয় ভাল্লুক ইত্যাদি।
অর্থনীতি
অরুনাচল প্রদেশ রাজ্যের অর্থনীতির প্রধান উৎস কৃষি, শিল্প এবং প্রাকৃতিক সম্পদ।
কৃষি
কৃষিকাজ এই রাজ্যের বেশীরভাগ মানুষদের জীবিকার অন্যতম উৎস। এই রাজ্যের কৃষকরা ঝুম চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করে পাহাড়ের একটি নির্বাচিত এলাকার গাছ কেটে পরিষ্কার করে সেই জমি চাষের জন্য ব্যবহার করে থাকে এবং পরবর্তী বছরগুলিতে কৃষকরা অন্য বনভূমিতে স্থানান্তরিত হয়, যার ফলে এই চাষাবাদকে স্থানান্তরিত চাষও বলা হয়। রাজ্যের মোট চাষকৃত এলাকার প্রায় ৫৩% ঝুমচাষ এবং বাকি অংশ স্থায়ী চাষের অধীনে। উৎপাদিত ফসলগুলির মধ্যে এরাজ্যের প্রধান ফসল হল ধান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ফসলগুলি হল ভুট্টা, বাজরা, গম, ডাল, আলু তৈলবীজ, আখ ইত্যাদি। এছাড়াও অরুণাচল প্রদেশের পরিবেশগত অবস্থা উদ্যান চাষ ও ফলের বাগানের জন্যও খুবই আদর্শ।
শিল্প
অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যটিতে কোনো ভারী শিল্প নেই। তবে কুটির শিল্প এবং ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বর্তমানে এই রাজ্যের শিল্প উন্নয়ন এক নতুন গতি পেয়েছে। এইসব শিল্পের মধ্যে রয়েছে করাতকল, রাইস মিল, ফল সংরক্ষণ, সাবান ও মোমবাতি তৈরি, ইস্পাত তৈরি, কাঠের শিল্প ইত্যাদি।
প্রাকৃতিক সম্পদ
প্রাকৃতিক সম্পদ হিসাবে অরুণাচল প্রদেশে কয়লা, খনিজ তেল ও গ্যাসের বিশাল মজুদ রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে লোহা, তামা, ডলোমাইট, চুনাপাথর, গ্রাফাইট, মার্বেল, সীসা, দস্তা ইত্যাদি।
জাতিগোষ্ঠী
অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যটি জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় একটি রাজ্য। উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতোই এই রাজ্যের মানুষও তিব্বত-বর্মী বংশোদ্ভূত। রাজ্যটিতে প্রায় ২৬টি প্রধান উপজাতি এবং প্রায় ১০০টিরও বেশি উপ-উপজাতি বসবাস করে। তবে এই রাজ্যের বৃহত্তম উপজাতিগুলি হল নিশি, আদি, গালো, তাগিন, মনপা এবং আপাতানি।
ভাষা
বর্তমানে, অরুণাচল প্রদেশ ভাষাগতভাবে এশিয়ার সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় অঞ্চল যেখানে ৩০ থেকে ৫০টি ভিন্ন ভাষার বক্তা রয়েছে। রাজ্যের সরকারি ভাষা হল ইংরেজি এবং কথিত প্রধান ভাষাগুলি হল নিশি, আদি, নেপালি, তাগিন, অসমীয়া, বাংলা, হিন্দি, চাকমা ইত্যাদি।
ধর্ম
ধর্মগত দিক থেকেও অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যটির ধর্মীয় ল্যান্ডস্কেপ বৈচিত্র্যময় এবং কোনো একক ধর্মীয়গোষ্ঠী জনসংখ্যার অধিকাংশ হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করে না। এই রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৩০.২৬% মানুষ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ২৯.০৪% মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী ২৬.২০% মানুষ ডনি-পোলো ধর্মাবলম্বী, ১১.৭৭% মানুষ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ১.৯৫% মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং ০.৭৮% মানুষ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।
শিক্ষাব্যবস্থা
শিক্ষাগত দিক থেকে অরুণাচল প্রদেশের মোট সাক্ষরতার হার ৬৫.৩৮ শতাংশ।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য
অরুণাচল প্রদেশের সংস্কৃতিও বৈচিত্র্যময় নানান ঐতিহ্যে ঘেরা। এই রাজ্যে বসবাসকারী প্রতিটি উপজাতির নিজদ আলাদা ঐতিহ্য এবং রীতিনীতি রয়েছে। সূর্য এবং চন্দ্র হল এই রাজ্যের প্রধান উপজাতিদের প্রধান দেবতা, বিশেষ করে যারা ডনি-পোলো ধর্ম পালন করে থাকেন।
এই রাজ্যের সাংস্কৃতিক জীবনধারা নানান রঙিন উৎসব দ্বারা প্রভাবিত। এখানে যেহেতু কৃষিই প্রধান ভিত্তি, তাই সাধারনত এখানকার লোকেরা সর্বশক্তিমানকে তাদের ভালো ফসল দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানানোর মাধ্যম হিসাবে বিভিন্ন উৎসব উদযাপন করে থাকেন। তাছাড়া এই উৎসবগুলি বিভিন্ন উপজাতিদের শৈল্পিক দক্ষতাও প্রদর্শন করে।
পরিবহন ব্যবস্থা
পরিবহন ব্যবস্থা হিসাবে অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যের সড়কপথ যথেষ্ট উন্নত। রাজ্যের প্রধান মহাসড়ক হল ট্রান্স-অরুণাচল হাইওয়ে, জাতীয় সড়ক ১৩, জাতীয় সড়ক ২২৯ এবং জাতীয় সড়ক ৫২।
বর্তমানে অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যটির কিছু অংশে রেলপথের সুবিধাও রয়েছে। নাহরলাগুন রেলওয়ে স্টেশন, ভালুকপং রেলওয়ে স্টেশন এবং গুমতো রেলওয়ে স্টেশন হল এরাজ্যের প্রধান রেলওয়ে স্টেশন।
আকাশপথ হিসাবে অরুণাচল প্রদেশের প্রধান বিমানবন্দরটি হল ডোনি পোলো এয়ারপোর্ট, যা এই রাজ্যের রাজধানী শহর ইটানগরে অবস্থিত।
পর্যটন
অরুণাচল প্রদেশের অতুলনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, ঐতিহ্যবাহী নানান স্থান এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি অতিসহজেই ভ্রমণকারীদের আকৃষ্ট করে তোলে। ফলে এই রাজ্যের কয়েকটি বিশেষ গন্তব্যস্থান হল –
তাওয়াং
ষষ্ঠতম দলাই লামার জন্মস্থান তাওয়াং তার সৌন্দর্য এবং সংস্কৃতির জন্য হয়ে উঠেছে সবার প্রিয় একটি জায়গা। এখানে রয়েছে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মঠ তাওয়াং বৌদ্ধ মঠটি।
দিরাং
পশ্চিম কামেং জেলায় অবস্থিত দিরাং, প্রকৃতি প্রেমী, ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফার এবং অ্যাডভেঞ্চার সন্ধানকারীদের জন্য স্বর্গের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।
অনিনি
দিবং উপত্যকা জেলার জেলা সদর অনিনি, যেখানে মেঘ নেমে এসে মাটিকে চুমু দেয়। এখানে অবস্থিত মিশমি পাহাড়গুলি সবচেয়ে সুন্দর কিছু পথ তৈরি করে। এখানকার সেভেন লেক ট্রেক আপনাকে হিমালয়ের সেরা গোপন রহস্যগুলির মধ্যে একটিতে নিয়ে যাবে।
জিরো
নিম্ন সুবনসিরি জেলায় অবস্থিত জিরো শহরটি সবুজ উপত্যকা, সুন্দর ধানক্ষেত এবং সুন্দর আপাটানি মানুষের জন্য পরিচিত। ফটোগ্রাফিক সৌন্দর্যের বাইরে একটি ভূমি তার বিশাল সাংস্কৃতিক এবং অজানা রীতিনীতির জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে।
নামসাই
বড়ো বড়ো ধান ক্ষেত, মৃদু নদী, বিস্তৃত চা বাগান, বিশাল গোল্ডেন প্যাগোডা, বিশাল বুদ্ধ মূর্তি, ঐতিহ্যবাহী বাঁশের ঘর এবং উষ্ণ মানুষ নামসাই এর প্রধান আকর্ষণ।
ডং উপত্যকা
আনজাও জেলায় অবস্থিত ডং উপত্যকা হল সেই জায়াগা যেখানে সূর্য প্রথম ভারতে তার রশ্মি ছড়িয়ে দেয় যখন দেশের বাকি মানুষেরা তখনও গভীর ঘুমে মগ্ন।
মেচুকা বা মেনচুখা
বিশাল পাহাড়, বিচিত্র গ্রাম, ঝুলন্ত ব্রিজ এবং ঘোড়া চরানো উপত্যকা দিয়ে ঘেরা অরুণাচল প্রদেশের একটি নিখুঁত গন্তব্যস্থান হল মেচুকা বা মেনচুখা।
এছাড়াও, অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যের অন্যান্য প্রধান গন্তব্য স্থানগুলি হল-
- সেলা গিরিপথ (Sela Pass)
- বুম লা গিরিপথ (Bumla Pass)
- নুরানং জলপ্রপাত (Nuranang Falls)
- ইটানগর শহর (Itanagar City)
- জওহরলাল নেহেরু স্টেট মিউজিয়াম (Jawaharlal Nehru State Museum)
- নামদাফা ন্যাশনাল পার্ক (Namdapha National Park),
- বোমডিলা (Bomdila)
- পরশুরাম কুন্ড (Parashuram Kund)
- ভীষ্মক নগর (Bhismak Nagar)
- আকাশীগঙ্গা (Akashiganga)
- পাসিঘাট (Pasighat) ইত্যাদি।
ভিডিও
অরুণাচল প্রদেশ (ARUNACHAL PRADESH) – ভারতের অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় | Explanation of Arunachal Pradesh State in Bengali
আরো ভিডিও দেখুন
(Explanation of Arunachal Pradesh State in Bengali)